চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পুরোনো জাহাজ কাটার সময় অসুস্থ হয়ে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রাথমিক কারণ হিসেবে জাহাজের ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাসকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ দলের ধারণা, জাহাজের ট্যাংক থেকে ব্যালাস্টের পানি বের করার সময় পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত হয়ে শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসে। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হলে এ ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে।
দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শনের পর গত বুধবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেয় বিশেষজ্ঞ কমিটি। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান।
তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্তমানে দুর্ঘটনাস্থলের বাতাসে এ গ্যাসের উপস্থিতি নেই। তবে ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় হাইড্রোজেন সালফাইড থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খানের ভাষ্য, ট্যাংকের পানি বের করার সময় পানিতে দ্রবীভূত গ্যাসটি মুক্ত হয়ে থাকতে পারে। সেই গ্যাসের সংস্পর্শেই শ্রমিকেরা আক্রান্ত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল থেকে পানি ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি বা জমা হয়েছিল, এর ঘনত্ব কত ছিল এবং পানি বের করার সময় কী পরিমাণ গ্যাস মুক্ত হয়েছিল; এসব বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
গত ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওই কারখানায় পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ ‘এমটি রাসি’ কাটার কাজ চলছিল। জাহাজটিতে চারটি ট্যাংক ছিল। এর মধ্যে একটি ট্যাংকের কাজ আগেই শেষ হয়েছিল। তিন নম্বর ট্যাংকে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
বিশেষজ্ঞ দলের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ওই ট্যাংকে ডি-ব্যালাস্টিং বা ব্যালাস্টের পানি বের করার কাজ চলছিল। পানি বের করার সময় তাতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস মুক্ত হয়ে শ্রমিকদের আক্রান্ত করে থাকতে পারে।
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পরীক্ষা চালায় বিস্ফোরক পরিদপ্তর। সংস্থাটির পরীক্ষায় শ্রমিকেরা যে অংশে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তখন বাতাসে গ্যাসটির মাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৮ পিপিএম। তবে দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর পরীক্ষা চালানোয় শ্রমিকেরা আক্রান্ত হওয়ার সময় বাতাসে গ্যাসটির প্রকৃত ঘনত্ব কত ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক অনুসন্ধানেও ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকেরা ঠিক কী মাত্রার গ্যাসের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
দুর্ঘটনাস্থলে অন্য কোনো বিষাক্ত গ্যাস ছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখেছে বিশেষজ্ঞ দল। অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান জানান, এ ধরনের ঘটনায় হাইড্রোজেন সালফাইডের পাশাপাশি কার্বন মনোক্সাইডও মারাত্মক হতে পারে। তবে তাদের পরীক্ষায় কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
এখন বিশেষজ্ঞ দলের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-ট্যাংকের পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি বা জমা হয়েছিল, পানিতে এর ঘনত্ব কত ছিল, পানি নিষ্কাশনের সময় কতটা গ্যাস মুক্ত হয়েছিল এবং শ্রমিকেরা কী মাত্রায় গ্যাসটির সংস্পর্শে এসেছিলেন। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পরীক্ষাগারের পূর্ণাঙ্গ ফলাফলের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তাই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান।
এ ঘটনায় মোট তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং জাহাজের ভেতরেও প্রবেশ করেছে। শিগগিরই তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও একজনের মৃত্যু হলে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনার পর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড।
তবে বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি ও শ্রমিকদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়া গেলেও, দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।




























