ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের কবলে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল। এর ফলে এখানকার ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ইতোমধ্যে ছয়টিতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। জালানির অভাবে আরও সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এসেছে তিন ভাগের এক ভাগে।
বাকি ১৩টি কেন্দ্র কোনোমতে উৎপাদনে থাকলেও পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে লোডশেডিং চরমে পৌঁছেছে। তীব্র গরমে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে টানা এক ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি না মেলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ নগরবাসী। পাশাপাশি চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলেও দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাতেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের অভাবে বিগত পাঁচ মাস ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন। সার কারখানাটি সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও তা সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ কারখানাটি উৎপাদনে ছিল।
এরপর থেকেই গ্যাস সংকটে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সিইউএফএলের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরন মারমা জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও চলতি মাসের শেষের দিকে তারা গ্যাস সরবরাহের আশা করছেন।
সরকারি কাগজপত্রে লোডশেডিংয়ের চিত্র আর বাস্তবের মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাগজে-কলমে কোনো লোডশেডিং না থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে বিস্তীর্ণ এলাকা। পিডিবির দাবি, চট্টগ্রামে দৈনিক পিক আওয়ারে ১ হাজার ৬৮ দশমিক ৭৯ মেগাওয়াট এবং অফ পিক আওয়ারে ৯৫৮ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে, যার পুরোটাই সরবরাহ করা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে কল্পলোক আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সকাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করা হচ্ছে। পিডিবি কাগজে-কলমে শূন্য মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখালেও প্রকৃত লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ২০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, জ্বালানি সংকটে যে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কাপ্তাই সোলার (৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট)।
এর পাশাপাশি রাউজান-১ ও রাউজান-২ নামের দুটি ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার টেকনাফ সোলার এবং ৫০ মেগাওয়াটের ইউনাইটেড পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সামনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সচল থাকা অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও যেকোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আনলিমা এনার্জি লিমিটেড (১১৬ মেগাওয়াট), আনোয়ারা ইউনাইটেড (৩০০ মেগাওয়াট) এবং বারাকা (৫০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন এখন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এছাড়া বারাকা কর্ণফুলী, জুলদা-১, জুলদা-২ এবং ৫৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার জুডিয়াক বিদ্যুৎকেন্দ্রও তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
নগরীতে পিডিবি এবং উপজেলাগুলোতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উৎপাদন ঘাটতির কারণে দুই জায়গাতেই গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে নগরীর পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন আবাসিক ও শিল্পাঞ্চলে জনজীবন রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বায়েজিদ বোস্তামীসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যা সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শিল্পকারখানা, ফ্ল্যাটবাড়ি এবং বড় বড় অফিস-আদালতে নিজস্ব জেনারেটর চালিয়েও দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের এই বহুমুখী সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাতের জন্য সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।























