মণিরামপুরের অসহায় ভোলার গল্প যেন আমাদের গ্রামীণ সমাজের এক নির্মম ও বাস্তব প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর দেশের সর্বত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন হলেও যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ৫ নম্বর হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের নিখিল বৈরাগী ওরফে ‘ভোলা’-র ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জীর্ণ ও অস্থায়ী একটি ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই মানসিক প্রতিবন্ধী প্রবীণ। নিজের কোনো জমিজমা না থাকায় বিভিন্ন চায়ের দোকানে জ্বালানি কাঠ কুড়িয়ে এনে দিনে মাত্র ৫০ থেকে ৮০ টাকা আয় করেন তিনি, যা দিয়ে কোনোমতে কাটছে তাঁদের অনাহার-অর্ধাহারের দিন।
দারিদ্র্যের এই কঠিন চক্র শুধু ভোলার জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর একমাত্র ছেলে মহাদেব বৈরাগীর সংসারেও সমানভাবে বিদ্যমান। মহাদেব অন্যের মাছের ঘেরে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে যে সামান্য মজুরি পান, তা দিয়ে নিজের স্ত্রী-সন্তানের আহার জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়। পিতা-পুত্রের সম্মিলিত চেষ্টায় তৈরি এক কামরার ছোট্ট ঘরটিতে সবার থাকার সংস্থান না হওয়ায় ভোলা ও তাঁর স্ত্রী বাধ্য হয়ে বাইরে আলাদা কুঁড়েঘরে বসবাস করছেন। এই আলাদা থাকা কোনো স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং চরম অভাব ও জায়গার সংকটের মুখে বাধ্য হয়ে করা এক হৃদয়বিদারক সমঝোতা।
সমাজের এক শ্রেণির মানুষ যখন রকমারি খাবারে দিন পার করে, তখন মণিরামপুরের অসহায় ভোলার গল্প উন্মোচন করে এক অন্য অভাবের বাস্তবতা। পরিবারটির দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় মাছ কিংবা মাংস যেন এক দূর আকাশের স্বপ্ন। দিনে একবেলা কোনোমতে যে এক তরকারি জোটে, তা দিয়েই পুরো পরিবারকে পেটের ক্ষুধা মেটাতে হয়। প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার খাওয়া তো দূরের কথা, কেবল দুবেলা পেট ভরে ভাত খেয়ে বেঁচে থাকাটাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরম দুর্দশায় দিন কাটলেও আশ্চর্যের বিষয় হলো পরিবারটি আজ পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তার মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সজল মল্লিক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নিখিল বৈরাগী ওরফে ভোলা কোনো প্রকার সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পান না। একই ওয়ার্ডে একজন পুরুষ ও একজন নারী জনপ্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও কেন এই পরিবারটির খোঁজ নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
মণিরামপুরের অসহায় ভোলার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র যখন ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ নানা সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি করছে, সেখানে ভোলাদের স্থান কোথায়? ভোলার পরিবারের প্রত্যাশা কিন্তু বিশাল কিছু নয়; তারা বিলাসিতা চান না, চান কেবল মাথা গোঁজার জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থান, নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য কাজের সুযোগ। একটি নিরাপদ ঘর বা পুষ্টিকর খাদ্য কোনো দয়া বা অনুদান নয়, বরং নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার এটি মৌলিক অধিকার।
সম্প্রতি বিষয়টি নজরে আসার পর মণিরামপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মণিরামপুর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা জনাব মো. সম্রাট হোসেন ঘটনাটির খবর পেয়ে জানান যে, তিনি সরেজমিনে তদন্ত করে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপে মণিরামপুরের অসহায় ভোলার গল্প নতুন আলোর দেখা পাবে এবং পরিবারটি শেষ বয়সে এসে সামান্য নিরাপদ আশ্রয় ও মানবিক সহায়তার সুযোগ পাবে।



























