দুই দিনে দুই শতাংশের বেশি কমার পর বিশ্ববাজারে আবার তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বাজারের সূচক অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯২ দশমিক ৪৪ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৫ দশমিক ৩৮ ডলারে পৌঁছেছে।
এর আগে টানা দুই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দুই শতাংশের বেশি কমেছিল। তবে ইরানকে ঘিরে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় সেই পতনের ধারা দ্রুত বদলে গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ। তেহরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর চাপ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইরানের তেল সরবরাহ ও রপ্তানি ব্যবস্থায় সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তেহরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামের ক্ষেত্রে সরবরাহের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বড় উৎপাদক দেশ থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই বাজারে ভবিষ্যৎ ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ে। এর প্রভাব অনেক সময় প্রকৃত সরবরাহ কমার আগেই আন্তর্জাতিক দামে দেখা যায়।
ইরানকে ঘিরে নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের বড় বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহে চাপ পড়তে পারে।
বিনিয়োগকারীরা তাই মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছেন। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষণকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণেও সরবরাহ ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের মতে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য উত্তেজনা যুক্ত হলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বাড়লে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের এমন পরিবর্তনের কারণে বেশি চাপে পড়ে। জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমলে কিংবা সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কেটে গেলে আবার তেলের দাম কমে আসতে পারে। বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানো হলে বা গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে বাজারে নতুন করে বড় উত্থান দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে তাই জ্বালানি খাতের বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে সরবরাহ পরিস্থিতি। ইরানের তেল রপ্তানি কতটা প্রভাবিত হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে কি না—এসব বিষয় আগামী দিনের বাজার নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে দুই দিনের দরপতনের পর আবারও তেলের দাম বাড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে অপরিশোধিত তেলের বাজার আরও অস্থির হতে পারে।




























