পোশাক কারখানা বন্ধ করে দিতে হলো দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে ব্যবসা করা এক উদ্যোক্তাকে। রাজধানীর মিরপুরে গড়ে ওঠা রপ্তানিমুখী ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস একসময় শত শত মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকলেও এখন সেটি তালাবদ্ধ। কারখানাটির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৯০ জন মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। এর মধ্যে ১৭৭ জন ছিলেন শ্রমিক। কিন্তু দীর্ঘদিনের নানা আর্থিক চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল হাসানের কাছে এটি শুধু একটি ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। প্রায় দুই দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে তিনি নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। কোনো ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু না করেও বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
মাহবুবুল হাসানের উদ্যোক্তা জীবনের শুরু ২০০৬ সালে। কয়েকজন অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথম একটি পোশাক কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। শুরুতে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের কাজ করলেও পরে সরাসরি রপ্তানিতে যান। কিন্তু অংশীদারদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে সেই উদ্যোগ বেশিদিন টেকেনি। এরপর ২০০৯ সালে নিজের উদ্যোগে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
আগের ব্যবসা থেকে পাওয়া প্রায় ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পুরোনো মেশিন কিনে নতুন কারখানার যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরু থেকেই নানা বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পাওয়া থেকে শুরু করে রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই ছিল জটিলতা। অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় কয়েকবার রপ্তানির অর্থ ও বিভিন্ন প্রণোদনা নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
তবু হাল ছাড়েননি মাহবুবুল হাসান। ২০১১ সালে মিরপুরের রূপনগরে কারখানা স্থানান্তর করে ধীরে ধীরে নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানি শুরু করেন। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসতে থাকে। সময়ের সঙ্গে ব্যবসাও বাড়ে। কয়েকটি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কাজ পেয়ে একসময় ম্যাট্রিক্স ড্রেসেসের অবস্থান বেশ শক্ত হয়।
কিন্তু পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে বড় একটি ধাক্কা আসে কারখানার নিরাপত্তা ও ভবনসংক্রান্ত নতুন নিয়মের কারণে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থায় কঠোরতা বাড়ানো হয়। যে ভবনে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস চলছিল, সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে আবারও নতুন জায়গায় কারখানা সরিয়ে নিতে হয়।
২০২২ সালের শেষ দিকে মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের পেছনে একটি ভাড়া শেডে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ২০২৩ সালে ব্যবসার সবচেয়ে ভালো সময়গুলোর একটি আসে। ওই বছর প্রায় ৪১ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের তৈরি পোশাক পাঠানো হতো।
কিন্তু এই সাফল্যের পরই ব্যবসার চিত্র বদলাতে শুরু করে। নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। পাশাপাশি গ্যাস-সংকটের কারণে বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ার খরচও বাড়তে থাকে। কিন্তু উদ্যোক্তার দাবি, বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি।
উল্টো কিছু ক্রেতা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কেউ কেউ পণ্য সরবরাহের সময়ও কমিয়ে দেয়। এর মধ্যে ব্যাংকিং জটিলতার কারণে সময়মতো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানিতেও সমস্যা দেখা দেয়। একের পর এক সংকটে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে দুর্বল হতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৩ সালে যে কারখানা প্রায় ৪১ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, ২০২৪ সালে সেই রপ্তানি নেমে আসে প্রায় ২০ লাখ ডলারে। পরের বছর তা আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৭ লাখ ডলারে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণে চলতি বছর কয়েক মাস ধরে কারখানাটিকে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
কিন্তু সাব-কন্ট্রাক্টিং করেও খরচ ওঠেনি। কারখানা চালু রাখতে উদ্যোক্তাকে প্রতি মাসে নিজের পকেট থেকে কয়েক লাখ টাকা দিতে হয়েছে। একসময় শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারখানার ভাড়াও মাসের পর মাস বকেয়া জমতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বন্ধক রাখতে হয়।
সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কারখানার দরজা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন মাহবুবুল হাসান। তাঁর ভাষায়, ব্যবসা করতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন এবং বড় অঙ্কের আর্থিক দায় এখন তাঁর কাঁধে। ১৯ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি এভাবে বন্ধ হয়ে যাবে, সেটি হয়তো তাঁর কল্পনাতেও ছিল না।
তবে কারখানাটি পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেখতেও চান না তিনি। এখন তাঁর চেষ্টা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে এমন কারও হাতে তুলে দেওয়া, যিনি আবার এটি চালু করতে পারবেন। তাঁর আশা, নতুন কোনো মালিকের হাত ধরে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস আবারও সচল হলে এত বছরের পরিশ্রমের কিছুটা হলেও মূল্য থাকবে।
এই ঘটনা শুধু একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি দেশের ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপেরও একটি বাস্তব চিত্র। রপ্তানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস-সংকট, শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকিং জটিলতা এবং ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ—সব মিলিয়ে অনেক উদ্যোক্তার জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান যখন শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়, তখন এর প্রভাব পড়ে শুধু মালিকের ওপর নয়, কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত শতাধিক মানুষের জীবনেও। একসময় যে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানি করত, আজ সেটি তালাবদ্ধ। আর কারখানার মালিক এখন নতুন করে জীবন ও ব্যবসার পথ খুঁজছেন।



























