সরকারি ক্রয় কমিটি পুনর্গঠন: কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ, কী পরিবর্তন আসতে পারে?
সরকারি ক্রয় কমিটি আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে নতুন করে পুনর্গঠন করেছে সরকার। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালুর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাই এই পুনর্গঠনের মূল উদ্দেশ্য।
রোববার (৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, পুনর্গঠিত কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। নতুন কমিটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়ন করবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও ফলপ্রসূ করার দিকেও কাজ করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সড়ক, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি এবং স্থানীয় সরকার প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়। এসব প্রকল্পে সময়মতো কাজ সম্পন্ন এবং অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কমিটির দায়িত্ব কী?
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটির প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ।
- সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যপদ্ধতি আরও কার্যকর করা।
- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ), ২০০৬ পর্যালোচনা।
- পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন।
- প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়ন।
- মন্ত্রিসভার সংশ্লিষ্ট কমিটির অর্পিত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
কী দায়িত্ব পালন করবে নতুন কমিটি?
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা। এছাড়া সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশও করবে কমিটি।
কমিটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ), ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫-এর আওতাধীন বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করবে। বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন ও বিধিমালার কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটিও মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ভবিষ্যতে যেসব দায়িত্ব অর্পণ করবে, সেগুলোও বাস্তবায়ন করবে এই কমিটি।
কারা রয়েছেন পুনর্গঠিত কমিটিতে?
সভাপতির পাশাপাশি কমিটিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন—
- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ
- শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ
- নৌপরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান
- স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম
- মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি
- অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার
- বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (BPPA) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহমেদ
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকায় এই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন প্রয়োজন হলো পুনর্গঠন?
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় দরপত্র মূল্যায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এ কারণে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আইন ও বিধিমালা হালনাগাদ করা, ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি কার্যকর কমিটি গঠন জরুরি হয়ে উঠেছিল। সরকারের নতুন এই উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসতে পারে?
নতুন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (e-GP) ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, দরপত্র মূল্যায়নের সময় কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয় জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকিউরমেন্ট নীতিমালা অনুসরণে নতুন দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
এছাড়া সরকারি অর্থের অপচয় কমানো, প্রকল্পের গুণগত মান উন্নয়ন, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তুলতেও এই কমিটির সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু প্রশাসনিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং সরকারি সেবার মান উন্নত করে।
সরকারের লক্ষ্য হলো একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিতকারী।



























