ঢাকা ০৯:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo অফিসের ডেস্কে রাখুন এই গাছ, মন থাকবে ফুরফুরে Logo স্থানীয় উদ্যোক্তা ঋণ পেতে তরুণদের অর্থায়ন কর্মসূচি Logo আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির অভিযোগ ‘এনসিপিতে ওপেন সিক্রেট’: রাশেদ খান Logo ইরানে শিশুদের মৃত্যু নিয়ে ইউনিসেফের নীরবতার সমালোচনা তেহরানের Logo মধ্যপ্রাচ্যকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান শি জিনপিংয়ের Logo নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, ওয়ার্ডে ঠাঁই না পেয়ে বারান্দায় রাত কাটছে রোগীদের Logo যে কারণে নভেম্বর পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের পক্ষে না ট্রাম্পের সহযোগীরা Logo খুলনা নগরীর তাপদাহ মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ ও জলাধার সংরক্ষণ Logo রান্নায় তেজপাতা কেন ব্যবহার করবেন, জানুন উপকারিতা Logo এআই দিয়ে লিখলে যে দক্ষতা হারাতে পারে শিক্ষার্থীরা

মধ্যপ্রাচ্যকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান শি জিনপিংয়ের

কায়রোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে বৈঠকে শি জিনপিং ও আল-সিসি। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিং তাঁর ঐতিহাসিক সফরে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। মিসরের রাজধানী কায়রোতে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক মালিক কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জনগণই। এক দশক পর মিসরে এই সফরের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক উত্তেজনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের নিজস্ব কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও জোরালো করার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বেইজিং।

চার বছরের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো মধ্যপ্রাচ্য সফর হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিং-এর এই আগমন আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কয়েক মাস ধরে লোহিত সাগর, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সামুদ্রিক নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, দুই শীর্ষ নেতা যৌথভাবে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয় জোরদার করা এবং ডেটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রযুক্তি খাতে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে মিসর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার হিসেবে বার্ষিক বিপুল পরিমাণ সহায়তা পেলেও সম্প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় কায়রো তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনতে চাইছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি শির সফরের আগে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার এই যুগে কায়রো একটি ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ রক্ষা করে সকল পরাশক্তির সঙ্গে বাণিজ্য প্রসার করতে আগ্রহী। ফলে সাবেক কূটনীতিকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে চীনসহ উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে সখ্য বাড়ানো মিসরের জন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত মাসে আয়োজিত ‘ঈগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামের যৌথ সামরিক মহড়ায় চীনের তৈরি জে-১৬ এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের বিরল মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে ১১ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠীর বাজার এবং সুয়েজ খালের ওপর মিসরের নিয়ন্ত্রণ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য আমদানির মাধ্যমে আফ্রিকার প্রবেশদ্বার হিসেবে কায়রো চীনের কাছে এক অমূল্য অর্থনৈতিক অংশীদারে রূপ নিয়েছে।

বুধবারের এই ঐতিহাসিক বৈঠকে বাণিজ্য লেনদেনে মার্কিন ডলারের পরিপূরক হিসেবে পারস্পরিক নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়ে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। মিসরীয় মন্ত্রিসভা জানিয়েছে যে সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীনা কোম্পানিগুলো এবং নতুন করে আরও টায়ার উৎপাদন ও সবুজ হাইড্রোজেন কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। চীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের বাণিজ্য ও মুদ্রা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার নীতি গ্রহণ করায় এবং সার্বিক বাণিজ্য বহুমুখী করতে উদ্যমী হওয়ায় তা মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের জন্য এক বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিং-এর এই আগমন এবং যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব লোহিত সাগর কেন্দ্রিক চলমান অনিশ্চয়তা ও মার্কিন সামরিক কৌশলকে গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়নের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুসহ আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে মিসরের ব্যাপক প্রভাব থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়িত্ব রক্ষায় বেইজিং কায়রোকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক বলয়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করেও অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নৌ-নিরাপত্তায় চীনের এই নীরব প্রবেশ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনে দেবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

অফিসের ডেস্কে রাখুন এই গাছ, মন থাকবে ফুরফুরে

মধ্যপ্রাচ্যকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান শি জিনপিংয়ের

Update Time : ০৬:৩৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিং তাঁর ঐতিহাসিক সফরে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। মিসরের রাজধানী কায়রোতে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক মালিক কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জনগণই। এক দশক পর মিসরে এই সফরের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক উত্তেজনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের নিজস্ব কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও জোরালো করার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বেইজিং।

চার বছরের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো মধ্যপ্রাচ্য সফর হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিং-এর এই আগমন আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কয়েক মাস ধরে লোহিত সাগর, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সামুদ্রিক নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, দুই শীর্ষ নেতা যৌথভাবে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয় জোরদার করা এবং ডেটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রযুক্তি খাতে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।

আরও পড়ুন  রোববারই সই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি: ট্রাম্প

দীর্ঘদিন ধরে মিসর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার হিসেবে বার্ষিক বিপুল পরিমাণ সহায়তা পেলেও সম্প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় কায়রো তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনতে চাইছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি শির সফরের আগে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার এই যুগে কায়রো একটি ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ রক্ষা করে সকল পরাশক্তির সঙ্গে বাণিজ্য প্রসার করতে আগ্রহী। ফলে সাবেক কূটনীতিকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে চীনসহ উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে সখ্য বাড়ানো মিসরের জন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত মাসে আয়োজিত ‘ঈগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামের যৌথ সামরিক মহড়ায় চীনের তৈরি জে-১৬ এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের বিরল মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে ১১ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠীর বাজার এবং সুয়েজ খালের ওপর মিসরের নিয়ন্ত্রণ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য আমদানির মাধ্যমে আফ্রিকার প্রবেশদ্বার হিসেবে কায়রো চীনের কাছে এক অমূল্য অর্থনৈতিক অংশীদারে রূপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন  তেল নিয়ে নতুন শঙ্কা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে বাড়ল দাম

বুধবারের এই ঐতিহাসিক বৈঠকে বাণিজ্য লেনদেনে মার্কিন ডলারের পরিপূরক হিসেবে পারস্পরিক নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়ে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। মিসরীয় মন্ত্রিসভা জানিয়েছে যে সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীনা কোম্পানিগুলো এবং নতুন করে আরও টায়ার উৎপাদন ও সবুজ হাইড্রোজেন কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। চীন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের বাণিজ্য ও মুদ্রা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার নীতি গ্রহণ করায় এবং সার্বিক বাণিজ্য বহুমুখী করতে উদ্যমী হওয়ায় তা মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যের জন্য এক বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন  বিশ্বে তেলের চাহিদা কমবে ভয়াবহ সতর্কতা আইইএর

সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিং-এর এই আগমন এবং যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব লোহিত সাগর কেন্দ্রিক চলমান অনিশ্চয়তা ও মার্কিন সামরিক কৌশলকে গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়নের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুসহ আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে মিসরের ব্যাপক প্রভাব থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়িত্ব রক্ষায় বেইজিং কায়রোকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক বলয়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করেও অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নৌ-নিরাপত্তায় চীনের এই নীরব প্রবেশ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনে দেবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।