ঢাকা ০৮:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo বেসরকারি ব্যাংকে নিয়োগে নতুন নিয়ম, পরীক্ষা বাধ্যতামূলক Logo রামুতে ১৫ একর জমি পেল বাফুফে, এগোচ্ছে ফিফার প্রকল্প Logo পাকিস্তান দলের পরিবর্তন নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন শোয়েব আখতার Logo কবজির চোট কাটিয়ে ইউএস ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে আলকারাজ Logo পাকিস্তান দল নিয়ে শোয়েব আখতারের বিস্ফোরক মন্তব্য Logo রোনালদোকে ছাড়িয়ে মেসির পাশে রাফিনিয়া, বার্সার হয়ে গড়লেন দুর্দান্ত রেকর্ড Logo ১২ বছর পর ইংল্যান্ড দলে ফিরলেন পিটারসেন, বিশ্বকাপের আগে বড় দায়িত্ব Logo পাকিস্তান ক্রিকেটে সাহস ও লড়াই নেই, কড়া সমালোচনায় ডি ভিলিয়ার্স Logo তিন বছর পর দলে কোয়েটজি, অস্ট্রেলিয়া সিরিজে ডি কক-মিলার Logo আসিফ মাহমুদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন

“চট্টগ্রামের মেলা” হলো এক ঐতিহ্য ও উৎসবের প্রাণবন্ত গল্প

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৬:৩৩:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৯

ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির নানা আয়োজনে জমে ওঠে চট্টগ্রামের মেলা।

চট্টগ্রামের মেলা মানেই শুধু দোকানপাট, খেলনা কিংবা খাবারের পসরা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আনন্দ, স্মৃতি, লোকসংস্কৃতি ও বহু বছরের ঐতিহ্য। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একটু দূরে গিয়ে মেলার মাঠে মানুষ যখন একসঙ্গে জড়ো হয়, তখন সেখানে তৈরি হয় ভিন্ন এক পরিবেশ। শিশুদের চোখে নতুন খেলনার উচ্ছ্বাস, বড়দের পুরোনো দিনের স্মৃতি আর কারিগরদের হাতে তৈরি পণ্যের সমাহার মিলিয়ে মেলা হয়ে ওঠে মানুষের মিলনস্থল। চট্টগ্রামের মেলার বৈচিত্র্যও বেশ বড়। বৈশাখী মেলা, জব্বারের বলীখেলা ঘিরে আয়োজন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্ষবরণ উৎসবের সঙ্গে যুক্ত মেলা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের জব্বারের বলীখেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকউৎসব, আর এর সঙ্গে বড় মেলার আয়োজনও হয়ে থাকে।

চট্টগ্রামের মেলা নিয়ে কথা উঠলে সবার আগে যে আয়োজনটির কথা আসে, সেটি হলো লালদিঘির মাঠের জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা। ১৯০৯ সালে আবদুল জববার সওদাগর লালদিঘির মাঠে এই বলীখেলার প্রচলন করেন। সময়ের সঙ্গে খেলাটি চট্টগ্রামের অন্যতম পরিচিত লোকজ আয়োজন হয়ে ওঠে। বলীখেলাকে ঘিরে লালদিঘির আশপাশে কয়েক দিনের মেলা বসে। সেখানে দেখা যায় বাঁশ, বেত, কাঠ ও মাটির তৈরি নানা পণ্য, খেলনা, মুখোশ, গৃহস্থালির সামগ্রী এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প। মেলার খাবারের অংশও কম আকর্ষণীয় নয়। মুড়ি, বাতাসা, নাড়ু, জিলাপি, মিষ্টি, মৌসুমি ফলসহ নানা ধরনের খাবারের পসরা বসে। শিশুদের জন্য থাকে নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন। অর্থাৎ একটি বলীখেলা কীভাবে একটি বড় সামাজিক ও বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, লালদিঘির মেলা তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

মেলার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর মানুষের অংশগ্রহণ। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক শুধু কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্রামের কারিগর নিজের হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে আসেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী দোকান সাজান, আর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবার নিয়ে মেলায় আসেন। ফলে চট্টগ্রামের মেলা স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। অনেক কারিগরের জন্য মেলা নিজের তৈরি পণ্য সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

একই সঙ্গে মেলায় পাওয়া বাঁশ-বেতের সামগ্রী, মাটির পুতুল, কাঠের জিনিস বা লোকজ খেলনা আমাদের পুরোনো কারুশিল্পের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একসময় যে জিনিসগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল, আধুনিকতার কারণে সেগুলোর অনেকটাই এখন কম ব্যবহার হয়। মেলার মাঠে সেই পণ্যগুলো আবার মানুষের সামনে ফিরে আসে। এ কারণেই মেলা কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, লোকশিল্প ও কারুশিল্প টিকিয়ে রাখারও একটি মাধ্যম।

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার মেলা ও উৎসবের ধরনও একরকম নয়। সমতলের বৈশাখী আয়োজনের পাশাপাশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসবও রয়েছে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্যে চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের মহামুনির মেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব যথাক্রমে বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুক নামে পরিচিত। এসব উৎসবের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় মেলার আয়োজনও হয়। কোথাও ধর্মীয় আচার, কোথাও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, কোথাও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আবার কোথাও খাবার ও হস্তশিল্প হয়ে ওঠে উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। ফলে চট্টগ্রামের মেলা এই অঞ্চলের বহু মানুষের জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একসঙ্গে তুলে ধরে।

সময় বদলেছে, মানুষের বিনোদনের ধরনও বদলেছে। আগে একটি মেলা ছিল গ্রামের মানুষের অন্যতম বড় বিনোদনের জায়গা। এখন হাতে স্মার্টফোন, অনলাইনে কেনাকাটা এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন থাকায় মেলার প্রয়োজনীয়তা আগের মতো মনে নাও হতে পারে। তবু বাস্তবে মেলার আকর্ষণ পুরোপুরি কমেনি। কারণ অনলাইনে কেনাকাটা করা গেলেও মেলার ভিড়, মানুষের কোলাহল, হাতে তৈরি পণ্য দেখে পছন্দ করা কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ আলাদা। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো মানুষের কাছে স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত।

ছোটবেলায় মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই বড় হয়ে ওঠার পরও মনে থাকে। তাই নতুন প্রযুক্তির যুগেও চট্টগ্রামের মেলা তার সামাজিক আবেদন ধরে রেখেছে। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন এসব আয়োজনের ছবি, ভিডিও ও গল্প আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

একটি মেলার আসল সৌন্দর্য তার পসরা বা বিনোদনের মধ্যে যতটা, মানুষের মিলনের মধ্যে তার চেয়েও বেশি। চট্টগ্রামের মেলা সেই মিলনের জায়গাটিই বছরের পর বছর ধরে ধরে রেখেছে। এখানে পুরোনো প্রজন্ম নিজেদের পরিচিত ঐতিহ্য খুঁজে পায়, আর নতুন প্রজন্ম জানতে পারে আগের দিনের জীবন ও সংস্কৃতির গল্প। তাই এসব আয়োজনকে শুধু আনন্দের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। স্থানীয় ইতিহাস, লোকশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার, খেলাধুলা ও মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে একসঙ্গে তুলে ধরার কারণে মেলা একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক আর্কাইভের মতো কাজ করে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয় কারিগর, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মেলার পুরোনো গল্প, ছবি, লোকগান, পণ্য ও রীতিগুলো নথিভুক্ত করা দরকার। কারণ চট্টগ্রামের মেলা টিকে থাকা মানে শুধু একটি আয়োজন টিকে থাকা নয়; এর সঙ্গে টিকে থাকে মানুষের স্মৃতি, লোকসংস্কৃতি ও একটি অঞ্চলের বহু বছরের সামাজিক ইতিহাস। জব্বারের বলীখেলা থেকে বৈশাখী মেলা, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আয়োজন থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ, সব মিলিয়েই চট্টগ্রামের মেলা এই অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বেসরকারি ব্যাংকে নিয়োগে নতুন নিয়ম, পরীক্ষা বাধ্যতামূলক

“চট্টগ্রামের মেলা” হলো এক ঐতিহ্য ও উৎসবের প্রাণবন্ত গল্প

Update Time : ০৬:৩৩:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের মেলা মানেই শুধু দোকানপাট, খেলনা কিংবা খাবারের পসরা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আনন্দ, স্মৃতি, লোকসংস্কৃতি ও বহু বছরের ঐতিহ্য। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একটু দূরে গিয়ে মেলার মাঠে মানুষ যখন একসঙ্গে জড়ো হয়, তখন সেখানে তৈরি হয় ভিন্ন এক পরিবেশ। শিশুদের চোখে নতুন খেলনার উচ্ছ্বাস, বড়দের পুরোনো দিনের স্মৃতি আর কারিগরদের হাতে তৈরি পণ্যের সমাহার মিলিয়ে মেলা হয়ে ওঠে মানুষের মিলনস্থল। চট্টগ্রামের মেলার বৈচিত্র্যও বেশ বড়। বৈশাখী মেলা, জব্বারের বলীখেলা ঘিরে আয়োজন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্ষবরণ উৎসবের সঙ্গে যুক্ত মেলা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের জব্বারের বলীখেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকউৎসব, আর এর সঙ্গে বড় মেলার আয়োজনও হয়ে থাকে।

চট্টগ্রামের মেলা নিয়ে কথা উঠলে সবার আগে যে আয়োজনটির কথা আসে, সেটি হলো লালদিঘির মাঠের জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা। ১৯০৯ সালে আবদুল জববার সওদাগর লালদিঘির মাঠে এই বলীখেলার প্রচলন করেন। সময়ের সঙ্গে খেলাটি চট্টগ্রামের অন্যতম পরিচিত লোকজ আয়োজন হয়ে ওঠে। বলীখেলাকে ঘিরে লালদিঘির আশপাশে কয়েক দিনের মেলা বসে। সেখানে দেখা যায় বাঁশ, বেত, কাঠ ও মাটির তৈরি নানা পণ্য, খেলনা, মুখোশ, গৃহস্থালির সামগ্রী এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প। মেলার খাবারের অংশও কম আকর্ষণীয় নয়। মুড়ি, বাতাসা, নাড়ু, জিলাপি, মিষ্টি, মৌসুমি ফলসহ নানা ধরনের খাবারের পসরা বসে। শিশুদের জন্য থাকে নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন। অর্থাৎ একটি বলীখেলা কীভাবে একটি বড় সামাজিক ও বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, লালদিঘির মেলা তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

আরও পড়ুন  রামিসা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দম্পতির আপিল শুনানিতে সম্মতি হাইকোর্টের

মেলার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর মানুষের অংশগ্রহণ। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক শুধু কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্রামের কারিগর নিজের হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে আসেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী দোকান সাজান, আর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবার নিয়ে মেলায় আসেন। ফলে চট্টগ্রামের মেলা স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। অনেক কারিগরের জন্য মেলা নিজের তৈরি পণ্য সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

একই সঙ্গে মেলায় পাওয়া বাঁশ-বেতের সামগ্রী, মাটির পুতুল, কাঠের জিনিস বা লোকজ খেলনা আমাদের পুরোনো কারুশিল্পের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একসময় যে জিনিসগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল, আধুনিকতার কারণে সেগুলোর অনেকটাই এখন কম ব্যবহার হয়। মেলার মাঠে সেই পণ্যগুলো আবার মানুষের সামনে ফিরে আসে। এ কারণেই মেলা কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, লোকশিল্প ও কারুশিল্প টিকিয়ে রাখারও একটি মাধ্যম।

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার মেলা ও উৎসবের ধরনও একরকম নয়। সমতলের বৈশাখী আয়োজনের পাশাপাশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসবও রয়েছে।

আরও পড়ুন  বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের মিলনে গড়া এক অনন্য গল্প 'চট্টগ্রামের সাংস্কৃতি'

বাংলাপিডিয়ার তথ্যে চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের মহামুনির মেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব যথাক্রমে বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুক নামে পরিচিত। এসব উৎসবের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় মেলার আয়োজনও হয়। কোথাও ধর্মীয় আচার, কোথাও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, কোথাও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আবার কোথাও খাবার ও হস্তশিল্প হয়ে ওঠে উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। ফলে চট্টগ্রামের মেলা এই অঞ্চলের বহু মানুষের জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একসঙ্গে তুলে ধরে।

সময় বদলেছে, মানুষের বিনোদনের ধরনও বদলেছে। আগে একটি মেলা ছিল গ্রামের মানুষের অন্যতম বড় বিনোদনের জায়গা। এখন হাতে স্মার্টফোন, অনলাইনে কেনাকাটা এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন থাকায় মেলার প্রয়োজনীয়তা আগের মতো মনে নাও হতে পারে। তবু বাস্তবে মেলার আকর্ষণ পুরোপুরি কমেনি। কারণ অনলাইনে কেনাকাটা করা গেলেও মেলার ভিড়, মানুষের কোলাহল, হাতে তৈরি পণ্য দেখে পছন্দ করা কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ আলাদা। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো মানুষের কাছে স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত।

ছোটবেলায় মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই বড় হয়ে ওঠার পরও মনে থাকে। তাই নতুন প্রযুক্তির যুগেও চট্টগ্রামের মেলা তার সামাজিক আবেদন ধরে রেখেছে। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন এসব আয়োজনের ছবি, ভিডিও ও গল্প আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন  ১৮ কোটি টাকার হাসপাতাল এখন শিয়ালের আবাসস্থল

একটি মেলার আসল সৌন্দর্য তার পসরা বা বিনোদনের মধ্যে যতটা, মানুষের মিলনের মধ্যে তার চেয়েও বেশি। চট্টগ্রামের মেলা সেই মিলনের জায়গাটিই বছরের পর বছর ধরে ধরে রেখেছে। এখানে পুরোনো প্রজন্ম নিজেদের পরিচিত ঐতিহ্য খুঁজে পায়, আর নতুন প্রজন্ম জানতে পারে আগের দিনের জীবন ও সংস্কৃতির গল্প। তাই এসব আয়োজনকে শুধু আনন্দের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। স্থানীয় ইতিহাস, লোকশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার, খেলাধুলা ও মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে একসঙ্গে তুলে ধরার কারণে মেলা একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক আর্কাইভের মতো কাজ করে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয় কারিগর, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মেলার পুরোনো গল্প, ছবি, লোকগান, পণ্য ও রীতিগুলো নথিভুক্ত করা দরকার। কারণ চট্টগ্রামের মেলা টিকে থাকা মানে শুধু একটি আয়োজন টিকে থাকা নয়; এর সঙ্গে টিকে থাকে মানুষের স্মৃতি, লোকসংস্কৃতি ও একটি অঞ্চলের বহু বছরের সামাজিক ইতিহাস। জব্বারের বলীখেলা থেকে বৈশাখী মেলা, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আয়োজন থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ, সব মিলিয়েই চট্টগ্রামের মেলা এই অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি।