ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির নাম শুনলে অনেক রোগী নানা কারণে ভয় পেয়ে যান। অনেকে মনে করেন যে এতে শরীর পুড়ে যায় কিংবা অসহনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আবার অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে এটি কেবল ক্যানসারের শেষ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়। বাস্তবে এই ধারণাগুলোর অধিকাংশই সম্পূর্ণ ভুল বা পুরোনো তথ্যনির্ভর।
রেডিওথেরাপিতে উচ্চ শক্তির রশ্মির সাহায্যে ক্ষতিকর ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়। এই চিকিৎসার সময় সাধারণত রোগীরা কোনো ধরনের ব্যথা, গরম বা বিদ্যুৎপ্রবাহ অনুভব করেন না। পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে অনেকটা সাধারণ সিটি স্ক্যানের মতো হয়ে থাকে। এটি শুধু রোগের শেষ পর্যায়েই দেওয়া হয় না। কখনো অস্ত্রোপচারের আগে টিউমার ছোট করতে, কখনো অস্ত্রোপচারের পর বেঁচে থাকা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে এবং কখনো কেমোথেরাপির সঙ্গে সহযোগী হিসেবেও এটি দেওয়া হয়। অ্যাডভান্সড ক্যানসারে তীব্র ব্যথা, রক্তক্ষরণ কিংবা অন্যান্য উপসর্গ কমাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পেট-সিটির উন্নত তথ্য ব্যবহার করে টিউমারের সঠিক ও নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করা হয়। আইএমআরটি, ভিম্যাট, আইজিআরটি ও এসবিআরটির মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমারের নির্দিষ্ট আকৃতি অনুযায়ী নির্ভুলভাবে রেডিয়েশন প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো টিউমারে প্রয়োজনীয় রেডিয়েশন পৌঁছে দেওয়া এবং আশপাশের হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, কিডনি, অন্ত্র বা লালাগ্রন্থির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাভাবিক অঙ্গগুলো যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা। শরীরের যে অংশে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং রেডিয়েশনের মাত্রা ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো নির্ভর করে, যার বেশিরভাগই সাময়িক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
চিকিৎসা চলাকালে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া কখনো রেডিওথেরাপি বন্ধ করা উচিত নয়। অপ্রয়োজনীয় বিরতি চিকিৎসার সামগ্রিক কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। এ সময় পর্যাপ্ত পানি, প্রোটিন ও সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসার স্থানের ত্বক সবসময় পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখা জরুরি। ঘষাঘষি, গরম সেঁক, সুগন্ধি বা চিকিৎসকের পরামর্শহীন কোনো ক্রিম ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। শরীরে চিকিৎসাবিষয়ক যে চিহ্নগুলো দেওয়া হয়, তা নিজে থেকে মোছা বা নতুন করে আঁকা যাবে না।
সামর্থ্য অনুযায়ী হালকা হাঁটাচলা ও স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া উচিত এবং ক্লান্তবোধ করলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। ধূমপান, জর্দা ও গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্য পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। তবে জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খেতে না পারা, তীব্র ডায়রিয়া, রক্তক্ষরণ কিংবা গুরুতর ত্বকের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসককে জানাতে হবে। সাধারণ এক্সটার্নাল বিম রেডিওথেরাপির পর রোগীর শরীর তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় না, ফলে রোগীরা পরিবারের সদস্য ও শিশুদের সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারেন।


























