ব্যস্ত জীবনে আলাদা করে ব্যায়ামের সময় বের করতে না পারলেও শরীর ও মন ভালো রাখার সুযোগ রয়েছে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র কয়েক মিনিটের শারীরিক কর্মকাণ্ডও মন-মেজাজ ও শক্তির মাত্রা বাড়াতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, অল্প সময় হাঁটা কিংবা ঘরের কাজের মতো সাধারণ নড়াচড়াও উপকারী হতে পারে। অর্থাৎ শরীরচর্চার জন্য সবসময় দীর্ঘ সময় বা কঠিন অনুশীলনের প্রয়োজন নেই।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ সাময়িকীতে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে ৬৭টি আলাদা তথ্যভান্ডার থেকে পাওয়া ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি মেজাজ-সংক্রান্ত মূল্যায়নও অন্তর্ভুক্ত ছিল। দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের মেজাজের মধ্যে সম্পর্ক বোঝাই ছিল গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে যতটা চলাফেরা করেন, তার তুলনায় সামান্য বেশি শারীরিক কর্মকাণ্ড করলেও দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এতে মন-মেজাজ ভালো হওয়ার পাশাপাশি শক্তির মাত্রাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ ব্যায়ামের জন্য জিম বা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় যাওয়াই একমাত্র উপায় নয়। দৈনন্দিন জীবনে নড়াচড়া বাড়ানোও শরীর ও মনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় হালকা ও মাঝারি মাত্রার বিভিন্ন শারীরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা এবং নিয়মিত ঘরের কাজের মতো কর্মকাণ্ড রয়েছে। ফলে লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা অল্প দূরত্বে গাড়ি বা রিকশার বদলে হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। ঘর পরিষ্কার করার মতো কাজও শরীরকে সক্রিয় রাখার সুযোগ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরচর্চার ক্ষেত্রে ছোট পদক্ষেপ দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। যারা নিয়মিত দৌড়াতে বা কঠিন ব্যায়াম করতে পারেন না, তারা হাঁটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও বাড়ির ভেতরেই কিছু সময় হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা সম্ভব। ব্যস্ততার কারণে আলাদা সময় না পেলে দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে শরীরচর্চাকে মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
শারীরিক কর্মকাণ্ড শুধু শরীরের জন্য নয়, মন ভালো রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় শারীরিক কর্মকাণ্ড ও মেজাজের মধ্যে দুই দিকের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শরীরচর্চা মন-মেজাজ ভালো করতে পারে, আবার মন ভালো থাকলে মানুষের আরও বেশি নড়াচড়া করার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। এভাবে শরীরচর্চা ও ভালো লাগার মধ্যে একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি হতে পারে।
শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় শরীরে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ বাড়তে পারে, যা আনন্দ, আগ্রহ ও কাজ করার ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দীর্ঘ সময় ব্যায়াম না করেও সামান্য নড়াচড়া থেকে ইতিবাচক অনুভূতি পাওয়া সম্ভব। তবে শারীরিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কর্মকাণ্ড বেছে নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
অনেকেই শরীরচর্চা শুরু করার আগে উৎসাহ বা আগ্রহ তৈরি হওয়ার অপেক্ষা করেন। কিন্তু গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় কাজ শুরু করার পরই আগ্রহ তৈরি হয়। তাই প্রথমেই বড় লক্ষ্য নির্ধারণ না করে কয়েক মিনিট হাঁটা, কয়েকবার ওঠবস করা কিংবা সিঁড়ি ব্যবহারের মতো সহজ কাজ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। ছোট অভ্যাস ধীরে ধীরে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হতে পারে।
শারীরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাইরে কিছুটা সময় কাটানোও মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। পার্ক, হাঁটার পথ বা সবুজ পরিবেশে হাঁটলে দৈনন্দিন চাপ থেকে কিছুটা বিরতি পাওয়া যায়। নতুন কোনো হাঁটার পথ খুঁজে দেখা বা কাছাকাছি কোনো জায়গায় হেঁটে যাওয়াও ভালো অভ্যাস হতে পারে। এতে শরীর সচল রাখার পাশাপাশি মনও সতেজ হওয়ার সুযোগ পায়।
গবেষণার বার্তা হলো, শরীরচর্চা মানেই কঠিন বা দীর্ঘ সময়ের অনুশীলন নয়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, ঘর পরিষ্কার করা, অল্প সময় হাঁটা কিংবা দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে নড়াচড়া বাড়ানোও শরীরকে সক্রিয় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তাই সময়ের অভাবে পুরোপুরি শরীরচর্চা বাদ না দিয়ে ছোট সুযোগগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে। কয়েক মিনিটের এই অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সক্রিয় জীবনযাপনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।




























