দেশে আবারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে হাম পরিস্থিতি। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
একদিনের ব্যবধানে নতুন এই মৃত্যুর ঘটনায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা জোরদারের কথা বলছেন। একই সঙ্গে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম গতকাল বিকেলে এ তথ্য জানায়। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে একজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিলেন।
অন্য চারজন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৪ জনে। এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৫৯ জন।
পাশাপাশি সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৮ হাজার ৩৩৪ জনে। অর্থাৎ নিশ্চিত রোগীর তুলনায় উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৮৪৫ জন রোগী। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১৫ হাজার ৭২৮ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।
বাকি রোগীরা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অনেক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে চাপ বাড়ছে বলে জানা গেছে। দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ভর্তি শিশুদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগী আগে টিকা নিয়েছিল। তাদের কেউ এক ডোজ, কেউ দুই ডোজ এমআর টিকা গ্রহণ করেছে।
তবুও আক্রান্তদের একাংশের মধ্যে জটিলতা দেখা যাচ্ছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ হতে পারে। তবে টিকা গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের অনেকের নিউমোনিয়া কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এ কারণে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।এদিকে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীকে অন্যত্র ফেরত পাঠানো যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। দেশের সব সরকারি হাসপাতালকে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশনা মানতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলেও রোগী ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ রোগী সেবা নিশ্চিত করতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এতে চিকিৎসা বঞ্চনার সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে জটিল ও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীকে রেফার করা যাবে। সেই ক্ষেত্রে নির্ধারিত রেফারাল শৃঙ্খল কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল, এরপর মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। অযথা রোগী ঘোরানো যাবে না বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ম লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রধানকে দায় নিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান এতে স্বাক্ষর করেন। মহাখালী কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নির্দেশ জারি করা হয়। ফলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় দ্রুত বিস্তার ঘটতে পারে। শিশুদের জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। টিকা কর্মসূচি জোরদার এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি।
সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচজনের মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।


























