সকালের শুরুতে এক কাপ চা বা কফি অনেকেরই পছন্দ। তবে পানীয়টি কতটা গরম, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। নতুন এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, খুব গরম চা-কফি পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির স্কোয়ামাস কোষ ক্যানসারের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় প্রায় ১০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চা বা কফি সাধারণত কী তাপমাত্রায় পান করেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। তারা পানীয়ের তাপমাত্রাকে উষ্ণ, গরম ও খুব গরম এই তিন ভাগে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দিনে কত কাপ গরম পানীয় পান করেন, সেই তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার তথ্য নেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের ‘মিলিয়ন উইমেন স্টাডি’ ও ‘ইউকে বায়োব্যাংক’ থেকে। এতে ৩৭ থেকে ৭৩ বছর বয়সী প্রায় ১০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে খাদ্যনালির ক্যানসারের সঙ্গে পানীয়ের তাপমাত্রার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়।দুই গবেষণার তথ্য একত্র করে দেখা যায়, যারা চা বা কফি ‘খুব গরম’ অবস্থায় পান করতেন, তাদের খাদ্যনালির স্কোয়ামাস কোষ ক্যানসারের ঝুঁকি উষ্ণপানীয় পানকারীদের তুলনায় ৩ দশমিক ১৭ গুণ বেশি ছিল। ‘গরম’ পানীয় পানকারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
গবেষকদের ধারণা, অতিরিক্ত গরম তরল দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যনালির ভেতরের আবরণে ক্ষতি ও প্রদাহ তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এ ধরনের ক্ষতি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ ঝুঁকির সঙ্গে চা বা কফির উপাদানের চেয়ে পানীয়ের তাপমাত্রার সম্পর্কই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।তবে খাদ্যনালির সব ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে একই সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। গবেষণায় খাদ্যনালির অ্যাডেনোকার্সিনোমার ঝুঁকির সঙ্গে পানীয়ের তাপমাত্রার এমন সম্পর্ক দেখা যায়নি। তাই গবেষণার ফলাফল নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পানীয়ের সম্পর্কের ওপরই কেন্দ্রীভূত।
শুধু পানীয়ের তাপমাত্রা নয়, দিনে কতবার গরম পানীয় পান করা হচ্ছে, সেটিও গবেষণায় বিবেচনা করা হয়েছে। যারা দিনে ছয় কাপ বা তার বেশি গরম পানীয় পান করতেন, তাদের স্কোয়ামাস কোষ ক্যানসারের ঝুঁকি ছয় কাপের কম পানকারীদের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি ছিল।গবেষকেরা ধূমপান, মদ্যপান ও শরীরের গঠনসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েও এই সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেছেন। ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাস এবং চায়ে দুধ মেশানোর মতো পার্থক্য থাকলেও খুব গরম পানীয়ের সঙ্গে বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার পানীয় মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। তবে এর অর্থ এই নয় যে চা বা কফি নিজেই ক্যানসার সৃষ্টি করে; পানীয়ের অতিরিক্ত তাপমাত্রা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পানীয় কিছুটা ঠান্ডা করে পান করা একটি সহজ সতর্কতা হতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে যারা বর্তমানে খুব গরম পানীয় পান করেন, তারা তাপমাত্রা কমিয়ে ‘গরম’ অবস্থায় পান করলে খাদ্যনালির স্কোয়ামাস কোষ ক্যানসারের কিছু ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।
চা বা কফি পরিবেশনের পর সঙ্গে সঙ্গে পান না করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যেতে পারে। জিহ্বায় পোড়া বা অসহ্য গরম লাগলে পানীয়টি এখনও অতিরিক্ত গরম থাকতে পারে। তাই ধোঁয়া ওঠা অবস্থায় পান না করে সহনীয় তাপমাত্রায় পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করাই নিরাপদ অভ্যাস হতে পারে।খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকির ক্ষেত্রে শুধু গরম পানীয় নয়, আরও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, স্থূলতা এবং দীর্ঘদিনের অম্লতা বা খাদ্যনালিতে অ্যাসিড ওঠার সমস্যাও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
চা বা কফি পান করার অভ্যাস থাকলে তা একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই গবেষণাটি মূলত পানীয়ের তাপমাত্রার বিষয়ে সতর্ক করছে। অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান না করে কিছুটা ঠান্ডা করে পান করা সহজ একটি অভ্যাস। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অম্লতা বা অন্য স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।




























