সৌরজগতের বাইরে থাকা একটি বহির্গ্রহ থেকে আসা রেডিও সংকেত শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। হার্ভার্ড অ্যান্ড স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকস ও ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের গবেষকদের একটি দল দক্ষিণ আফ্রিকার মিরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ অ্যারে ব্যবহার করে এই সংকেত শনাক্ত করে। তবে সংকেতটি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর পাঠানো বার্তা নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বহির্গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বক ক্ষেত্রের মিথস্ক্রিয়ার ফলে তৈরি মেরুজ্যোতি বা অরোরা থেকেই এই রেডিও তরঙ্গের উৎপত্তি। এর আগে কোনো বহির্গ্রহ থেকে এমন রেডিও সংকেত সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, সংকেতটির উৎস হলো বিটা পিকটোরিস নামের একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলোর একটি বিটা পিকটোরিস বি। পৃথিবী থেকে এই নক্ষত্র ব্যবস্থা প্রায় ৬৩ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা গ্রহটির দিক থেকে দ্রুত ও বারবার বৃত্তাকার মেরুকরণের রেডিও বার্স্ট শনাক্ত করেন। সংকেতটি নক্ষত্র থেকে আসছে নাকি গ্রহ থেকে, তা নিশ্চিত করতে দূরের একটি উজ্জ্বল কোয়াসারকে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশ্লেষণের পর গবেষকেরা সংকেতটির উৎস হিসেবে গ্রহটিকেই শনাক্ত করেন।
এই রেডিও সংকেত কীভাবে তৈরি হয়েছে, তারও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন মেসার ইনস্ট্যাবিলিটি নামের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেডিও তরঙ্গ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের প্রক্রিয়া শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সংকেত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা শুধু গ্রহটির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাননি, বরং এর চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি সম্পর্কেও ধারণা পেয়েছেন। বহির্গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত ও পরিমাপের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গবেষকদের ধারণা, বিটা পিকটোরিস বি-এর চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর তুলনায় প্রায় হাজার গুণ শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রহটির দ্রুত ঘূর্ণনও এর চারপাশে শক্তিশালী অরোরা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রহটি আকারেও বিশাল—এর ভর বৃহস্পতির প্রায় ১০ গুণ। শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ও বায়ুমণ্ডলের মিথস্ক্রিয়ার ফলে যে অরোরা তৈরি হয়, সেখান থেকেই শনাক্ত হওয়া রেডিও তরঙ্গের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই আবিষ্কার বহির্গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র ও বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে দূরের কোনো গ্রহের চৌম্বক পরিবেশ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো গ্রহের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তার বায়ুমণ্ডল ও মহাকাশীয় পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, তা বোঝার মাধ্যমে গ্রহটির প্রকৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এখন কাছাকাছি অন্যান্য নক্ষত্র ব্যবস্থায় থাকা বড় বহির্গ্রহগুলোর দিকেও নজর দিতে চান। ভবিষ্যতের আরও সংবেদনশীল রেডিও অবজারভেটরি চালু হলে এমন সংকেত শনাক্তের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোর চৌম্বক ক্ষেত্র, বায়ুমণ্ডল এবং মহাকাশীয় পরিবেশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মহাবিশ্বে গ্রহগুলোর বৈচিত্র্য ও তাদের পরিবেশ নিয়ে আমাদের জ্ঞানও আরও বিস্তৃত হতে পারে।




























