সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উচ্চ তাপমাত্রা ও করণীয় সংক্রান্ত একটি বার্তাকে ভুয়া বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, প্রচারিত ওই বার্তার সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। শনিবার সংস্থাটির মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে একটি বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে নির্দিষ্ট কয়েকটি সময়ে অতিরিক্ত গরম এবং সতর্কতামূলক কিছু নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই বার্তায় দাবি করা হয়, আগামী ২৯ এপ্রিল থেকে ১২ মে এবং ২৫ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সেখানে কিছু করণীয় উল্লেখ করে বলা হয়, এটি নাকি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, এমন কোনো বার্তা তারা প্রকাশ করেনি। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, গরমের সময় সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্যঝুঁকি, অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। সেই সুযোগে অনেক সময় ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হন এবং অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাচাই ছাড়া কোনো বার্তা বিশ্বাস না করতে। বিশেষ করে সরকারি সংস্থার নাম ব্যবহার করে ছড়ানো তথ্যের ক্ষেত্রে অফিসিয়াল সূত্র ছাড়া নিশ্চিত না হয়ে তা প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব বা ভুয়া বার্তা দ্রুত ছড়ানোর অন্যতম কারণ হলো মানুষ না যাচাই করেই তা শেয়ার করে দেন। এতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি মিথ্যা তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাপপ্রবাহ, আবহাওয়া পরিবর্তন কিংবা দুর্যোগ সংক্রান্ত বার্তা সাধারণত মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ফলে এ ধরনের বিষয় নিয়ে গুজব আরও দ্রুত ছড়ায়। অনেকে সতর্কতা হিসেবে ধরে নিয়ে অন্যদের পাঠিয়ে দেন।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আবহাওয়া সম্পর্কিত পূর্বাভাস দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া দপ্তরের। অন্যদিকে অগ্নিনির্বাপন, উদ্ধারকাজ এবং নাগরিক সুরক্ষা বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা তারা নিজস্ব সরকারি মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। সংস্থাটি আরও জানায়, সরকারি কোনো ঘোষণা সাধারণত তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট, যাচাইকৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পাতা অথবা গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তাই অপরিচিত সূত্র থেকে পাওয়া বার্তা বিশ্বাস করার আগে উৎস যাচাই করা জরুরি।
সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানো শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, অনেক সময় তা জননিরাপত্তার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভুল তথ্যের কারণে মানুষ প্রকৃত সতর্কতা বার্তাকেও গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন। এছাড়া অযাচিত আতঙ্ক তৈরি হলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ে। কেউ অকারণে বাইরে যাওয়া বন্ধ করেন, কেউ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কিত হন, আবার কেউ গুজবের ভিত্তিতে অন্যদের সতর্ক করতে গিয়ে আরও বিভ্রান্তি বাড়ান। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ছবি, লেখা ও লোগো ব্যবহার করে সরকারি বিজ্ঞপ্তির মতো দেখতে ভুয়া বার্তা তৈরি করা সহজ হয়ে গেছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে অনেক সময় সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই তারা পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো তথ্য দেখেই শেয়ার না করে প্রথমে সরকারি সূত্র, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। এদিকে আবহাওয়া গরম হলেও তাপমাত্রা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত পূর্বাভাস অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। কারণ তারাই দেশের আবহাওয়ার সরকারি তথ্য প্রকাশ করে থাকে। ফায়ার সার্ভিস আরও জানিয়েছে, জনগণের নিরাপত্তা ও সচেতনতার স্বার্থে তারা নিয়মিত তথ্য প্রচার করে। কিন্তু ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তাদের প্রকৃত বার্তাগুলোও আড়ালে পড়ে যেতে পারে। তাই এ বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এখন ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবার, বন্ধু কিংবা পরিচিত কারও কাছ থেকে পাওয়া বার্তাও যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ ভুল তথ্য যে কারও মাধ্যমেই ছড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্কুল, কলেজ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানো দরকার। এতে মানুষ দ্রুত বুঝতে শিখবে কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি নয়। সব মিলিয়ে, ফায়ার সার্ভিসের এই ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে ভাইরাল তাপবার্তাটি ভুয়া। তাই জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
























