দেশের অর্থনীতিতে আবারও বড় স্বস্তির খবর এনে দিয়েছে প্রবাসী আয়। চলতি মে মাসের প্রথম ৯ দিনেই দেশে এসেছে ১ বিলিয়নের বেশি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বৈধ পথে দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির এই ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটানো, মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতেও এ আয় কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
চলতি মাসের প্রথম ৯ দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ৪৩ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবাহ প্রায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ফলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মাস শেষে আবারও সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করতে পারে প্রবাসী আয়। সাধারণত দুই ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে যায়। প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। চলতি মাসের শেষ দিকে পবিত্র ঈদুল আযহা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এখন থেকেই দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
এর আগে গত মার্চ মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছিল। সে সময় দেশে আসে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বা ৩৭৫ কোটি ডলার। এখন পর্যন্ত এটিই দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। ওই সময় ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে অর্থ পাঠিয়েছিলেন।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ছয়বার একক মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে। গত বছরের মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার দেশে আসে। এরপর ডিসেম্বর মাসে আসে ৩২২ কোটি ডলার।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে আসে ৩১৭ কোটি ডলার প্রবাসী আয়। ফেব্রুয়ারিতে আসে ৩০২ কোটি ডলার। মার্চে রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলার এবং এপ্রিলে আসে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাস ধরে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় আসা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহজ সেবা, প্রণোদনা সুবিধা এবং অবৈধ চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়ক হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা নিয়মিতভাবে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মে পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী এই রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। যদিও দুই ধরনের হিসাবপদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, তবুও রিজার্ভ পরিস্থিতিকে এখন তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এখন পর্যন্ত মোট প্রবাসী আয় এসেছে ৩০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ২৫ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। কারণ রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয় এখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
তাদের মতে, বিশ্ববাজারে নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসীরা নিয়মিত অর্থ পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছেন। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতের চাপ এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা আরও বাড়াতে হলে প্রবাসীদের জন্য সহজ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ শুধু দেশের অর্থনীতিকেই সচল রাখছে না, লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নেও বড় অবদান রাখছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এই অর্থের ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলতি মাসে ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। ফলে মাস শেষে নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে আবারও সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারে দেশের প্রবাসী আয়।





















