ঢাকা ০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

গরু কোরবানি না করার আহ্বান পশ্চিমবঙ্গের আলেমদের

পশ্চিমবঙ্গে গরু কোরবানি বিতর্কে আলেমদের নতুন আহ্বান

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই ও বিক্রিতে নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে রাজ্য সরকার। এর জেরে রাজ্যের কয়েকজন প্রভাবশালী আলেম ও ইমাম মুসলিম সম্প্রদায়কে গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি অনুমতি ছাড়া গরু, ষাঁড়, বাছুর ও মহিষ জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের আগে স্থানীয় পৌরসভা চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত প্রধান এবং সরকারি পশুচিকিৎসকের যৌথ সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় কোরবানির বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, শুধুমাত্র ১৪ বছরের বেশি বয়সী অথবা কর্মক্ষমতা হারানো পশু জবাইয়ের অনুমতি পাবে। আইন লঙ্ঘন করলে জেল ও আর্থিক জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের পর কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা শফিক কাসমি মুসলিমদের উদ্দেশে গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

মাওলানা শফিক কাসমি বলেন, মুসলমানদের উচিত গরু কোরবানি না দেওয়া এবং গরুর মাংস খাওয়া থেকেও বিরত থাকা। তিনি দাবি করেন, গরুকে জাতীয় সুরক্ষিত প্রাণী ঘোষণা করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন হিন্দু খামারিরা, কারণ তারাই মূলত গরু লালন-পালন করে ঈদের সময় মুসলমানদের কাছে বিক্রি করেন।

তার এই বক্তব্য অনেকের কাছে আপসকামী অবস্থান হিসেবে দেখা দিলেও, কেউ কেউ এটিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাই ইস্যুতে অতীতে সংঘাতের ঘটনা সামনে আসায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের একাংশ সতর্ক অবস্থান নিতে চাইছে।

একই ধরনের মত দিয়েছেন হুগলির বিখ্যাত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা জিয়াউদ্দিন সিদ্দিকিও। তিনি বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে মানেন। তাই মুসলমানরা চাইলে ছাগল, ভেড়া বা অন্য পশু কোরবানি দিতে পারেন।

তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নকে দুর্বল করে দিতে পারে।

এদিকে সরকারের কড়াকড়ির কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন গরুর খামারি ও ব্যবসায়ীরা। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গে কয়েক হাজার কোটি রুপির গরুর বাজার তৈরি হয়। এই বাজারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অসংখ্য খামারি, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও চামড়া শিল্পের কর্মীরা।

উত্তর চব্বিশ পরগনার এক দুগ্ধ খামারি জানান, তার খামারে থাকা ১০টি শুকনো গরু বিক্রি করতে না পারলে প্রায় ১২ লাখ রুপি ক্ষতির মুখে পড়বেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে মুসলিম ক্রেতারাই এই ধরনের গরুর প্রধান ক্রেতা ছিলেন। এবার বাজারে সেই ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেছে।

আরেক খামারি বলেন, সরকার যদি বিক্রির সুযোগ সীমিত করে দেয়, তাহলে তাদের জন্য গরু পালন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক খামারি ব্যাংক ঋণ নিয়ে খামার পরিচালনা করেন। ঈদের বাজারে বিক্রি না হলে তারা ঋণ পরিশোধে সংকটে পড়বেন।

ইতোমধ্যে অনেক খামারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে সরকারের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নতুন নিয়মের কারণে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।

রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের নেতা নওশাদ সিদ্দিকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে চিঠি দিয়ে ঈদুল আজহা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, এটি কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং একটি বড় অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে জড়িত। তার দাবি, গরুর ব্যবসার বড় অংশই হিন্দু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের চামড়া শিল্পও এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

নওশাদ সিদ্দিকির মতে, আকস্মিকভাবে এমন কড়াকড়ি আরোপ করলে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতির মুখে পড়বেন। তিনি সরকারের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে বিজেপি নেতারা সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, এই আইন নতুন নয়। ১৯৫০ সালেই এই বিধান করা হয়েছিল। তখন বিজেপির অস্তিত্বই ছিল না। বর্তমান সরকার কেবল আইন বাস্তবায়ন করছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে ধর্মীয় কারণে কিছু ছাড় দিতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির বিরুদ্ধে যেতে পারে না। তার ভাষায়, লাখো মানুষ গরুকে মায়ের মর্যাদা দিয়ে থাকেন এবং তাদের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই ও কোরবানি নিয়ে এই বিতর্ক কেবল ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে গরু ও গোমাংসের বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে গরু সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন তুলনামূলক নমনীয়তা ছিল। তবে এবার রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ অনেকের কাছে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যুক্তি সামনে আনা হলেও, এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারি ও চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

এদিকে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যেও এ নিয়ে বিভক্ত মতামত দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করা উচিত নয়। আবার কেউ মনে করছেন, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিকল্প পশু কোরবানি দেওয়া যেতে পারে।

ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গে এই বিতর্কও ততই তীব্র হচ্ছে। সরকারের অবস্থান, আলেমদের আহ্বান, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং খামারিদের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে রাজ্যের কোরবানির বাজার এবার এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগদান

গরু কোরবানি না করার আহ্বান পশ্চিমবঙ্গের আলেমদের

Update Time : ০৮:২২:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই ও বিক্রিতে নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে রাজ্য সরকার। এর জেরে রাজ্যের কয়েকজন প্রভাবশালী আলেম ও ইমাম মুসলিম সম্প্রদায়কে গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি অনুমতি ছাড়া গরু, ষাঁড়, বাছুর ও মহিষ জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের আগে স্থানীয় পৌরসভা চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত প্রধান এবং সরকারি পশুচিকিৎসকের যৌথ সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় কোরবানির বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, শুধুমাত্র ১৪ বছরের বেশি বয়সী অথবা কর্মক্ষমতা হারানো পশু জবাইয়ের অনুমতি পাবে। আইন লঙ্ঘন করলে জেল ও আর্থিক জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের পর কলকাতার ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা শফিক কাসমি মুসলিমদের উদ্দেশে গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

মাওলানা শফিক কাসমি বলেন, মুসলমানদের উচিত গরু কোরবানি না দেওয়া এবং গরুর মাংস খাওয়া থেকেও বিরত থাকা। তিনি দাবি করেন, গরুকে জাতীয় সুরক্ষিত প্রাণী ঘোষণা করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন হিন্দু খামারিরা, কারণ তারাই মূলত গরু লালন-পালন করে ঈদের সময় মুসলমানদের কাছে বিক্রি করেন।

আরও পড়ুন  বৈজ্ঞানিক হিসাব বলছে ঈদুল আজহার সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করল আমিরাত

তার এই বক্তব্য অনেকের কাছে আপসকামী অবস্থান হিসেবে দেখা দিলেও, কেউ কেউ এটিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাই ইস্যুতে অতীতে সংঘাতের ঘটনা সামনে আসায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের একাংশ সতর্ক অবস্থান নিতে চাইছে।

একই ধরনের মত দিয়েছেন হুগলির বিখ্যাত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা জিয়াউদ্দিন সিদ্দিকিও। তিনি বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে মানেন। তাই মুসলমানরা চাইলে ছাগল, ভেড়া বা অন্য পশু কোরবানি দিতে পারেন।

তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নকে দুর্বল করে দিতে পারে।

এদিকে সরকারের কড়াকড়ির কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন গরুর খামারি ও ব্যবসায়ীরা। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গে কয়েক হাজার কোটি রুপির গরুর বাজার তৈরি হয়। এই বাজারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অসংখ্য খামারি, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও চামড়া শিল্পের কর্মীরা।

উত্তর চব্বিশ পরগনার এক দুগ্ধ খামারি জানান, তার খামারে থাকা ১০টি শুকনো গরু বিক্রি করতে না পারলে প্রায় ১২ লাখ রুপি ক্ষতির মুখে পড়বেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে মুসলিম ক্রেতারাই এই ধরনের গরুর প্রধান ক্রেতা ছিলেন। এবার বাজারে সেই ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেছে।

আরও পড়ুন  ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য কামরা বরাদ্দের নির্দেশ দিল হাইকোর্ট

আরেক খামারি বলেন, সরকার যদি বিক্রির সুযোগ সীমিত করে দেয়, তাহলে তাদের জন্য গরু পালন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক খামারি ব্যাংক ঋণ নিয়ে খামার পরিচালনা করেন। ঈদের বাজারে বিক্রি না হলে তারা ঋণ পরিশোধে সংকটে পড়বেন।

ইতোমধ্যে অনেক খামারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে সরকারের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, নতুন নিয়মের কারণে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।

রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের নেতা নওশাদ সিদ্দিকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে চিঠি দিয়ে ঈদুল আজহা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, এটি কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং একটি বড় অর্থনৈতিক খাতের সঙ্গে জড়িত। তার দাবি, গরুর ব্যবসার বড় অংশই হিন্দু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের চামড়া শিল্পও এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

নওশাদ সিদ্দিকির মতে, আকস্মিকভাবে এমন কড়াকড়ি আরোপ করলে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতির মুখে পড়বেন। তিনি সরকারের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে বিজেপি নেতারা সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, এই আইন নতুন নয়। ১৯৫০ সালেই এই বিধান করা হয়েছিল। তখন বিজেপির অস্তিত্বই ছিল না। বর্তমান সরকার কেবল আইন বাস্তবায়ন করছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে ধর্মীয় কারণে কিছু ছাড় দিতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির বিরুদ্ধে যেতে পারে না। তার ভাষায়, লাখো মানুষ গরুকে মায়ের মর্যাদা দিয়ে থাকেন এবং তাদের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন  নেতানিয়াহু ইরান যুদ্ধ নিয়ে কঠোর ঘোষণা, বাড়ছে উত্তেজনা

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই ও কোরবানি নিয়ে এই বিতর্ক কেবল ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে গরু ও গোমাংসের বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে গরু সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন তুলনামূলক নমনীয়তা ছিল। তবে এবার রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ অনেকের কাছে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার যুক্তি সামনে আনা হলেও, এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারি ও চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

এদিকে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যেও এ নিয়ে বিভক্ত মতামত দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করা উচিত নয়। আবার কেউ মনে করছেন, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিকল্প পশু কোরবানি দেওয়া যেতে পারে।

ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গে এই বিতর্কও ততই তীব্র হচ্ছে। সরকারের অবস্থান, আলেমদের আহ্বান, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং খামারিদের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে রাজ্যের কোরবানির বাজার এবার এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।