বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব গঠনের পথে অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই সহিংসতা একটি অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক নতুন গবেষণায় নারীর রাজনীতিতে আসার এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আজ শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিআইজিডি ও ইউএন উইমেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে গবেষক ও অংশীজনরা জানান, পুরুষ আধিপত্যশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, নারীদের আর্থিক সংকট ও পরনির্ভরশীলতা এবং পারিবারিক দায়িত্বের মতো একাধিক আন্তসম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতা এখনো রাজনীতিতে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে। জাতিসংঘের নির্বাচনী সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় পরিচালিত এই গুণগত গবেষণায় নারী সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সঙ্গে ৪৩টি নিবিড় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান প্রাসঙ্গিক আইনি ও নীতি কাঠামোর চুলচেরা পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই গবেষণার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী সেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন নিজের বাস্তব জীবনের এক তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে তাঁর প্রতিপক্ষের মূল অভিযোগ ছিল তাঁর স্বামী ভিন্ন নির্বাচনী এলাকার এবং তিনি নিজের এলাকার চেয়ে স্বামীর এলাকাকে বেশি প্রাধান্য দেবেন। যখন রাজনৈতিকভাবে সব অভিযোগ ব্যর্থ হলো, তখন প্রতিপক্ষরা তাঁর বিরুদ্ধে অনলাইনে ও সরাসরি নোংরা ও হয়রানিমূলক প্রচারণা শুরু করে।
প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি সম্মানিত রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসার পরেও যদি তাঁকে এই ধরনের অনলাইন ও অফলাইন হয়রানির শিকার হতে হয়, তবে সাধারণ নারীদের অবস্থা ভাবা যায় না। যেসব নারী তাঁর মতো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই, তাঁরা প্রতিদিন রাজনীতি করতে গিয়ে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটা ভাবলে সত্যিই শিউরে উঠতে হয়। অবশ্য এই হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন অপরাধীদের শাস্তি দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সর্বশেষ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। যেসব আসনে সরাসরি কোনো নারী প্রার্থী ছিলেন না, সেখানেও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় ও ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নারীদের ব্যাপক সাহায্য নিয়েছে। তবে শুধু অংশগ্রহণই যথেষ্ট নয়, নারীরা যেন রাজনীতিতে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে মতামত দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে বিএনপির নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের স্বাধীন প্রচারণায় নানা বাধার মুখে পড়লেও তিনি গত নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি আরও যোগ করেন, ধারাবাহিক বৈদেশিক চাপও দেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছে।
বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণ, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কথা না বললে নারী উন্নয়ন বিষয়ক কোনো আলোচনাই সম্পূর্ণ হয় না। গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে এই ধরনের গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা টিকিয়ে রাখাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।
ইউএন উইমেনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জli সিং বলেন, একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো বিকল্প ছাড়া অপরিহার্য শর্ত। এটি কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং একটি দেশের কার্যকর শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অধিক নারীর অংশগ্রহণ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু পরিচর্যা এবং নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের মতো আইনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠানে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী, সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান, সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা ও গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আক্তার।



























