মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে আলোচিত মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-কে সাভারের প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে-এ স্থানান্তর করা হয়েছে। অ্যালবিনো জাতের এই মহিষটি ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে প্রাণিসম্পদ গবেষণার অংশ হিসেবে মহিষটিকে কোয়ারেন্টাইনে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গত রোববার জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহিষটিকে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গবেষকরা বলছেন, মহিষটির স্বাস্থ্য, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রজনন সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিএলআরআই কর্মকর্তাদের মতে, মহিষটির ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য এবং অ্যালবিনো জিনগত বৈশিষ্ট্য গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ কারণে মহিষটিকে শুধু সংরক্ষণ নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মহিষ উৎপাদন গবেষণা বিভাগের প্রধান এবং প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা Goutam Kumar Dev-এর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি মহিষটির সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবে।
গৌতম কুমার দেব জানিয়েছেন, যেহেতু মহিষটি দীর্ঘদিন চিড়িয়াখানায় ছিল, তাই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এড়াতে ১৪ থেকে ২১ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। এই সময়ের মধ্যে রোগমুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।
গবেষকরা বলছেন, কোয়ারেন্টাইনের সময় মহিষটির খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্ষমতা, ওজন এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়েও প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যালবিনো মহিষ অত্যন্ত বিরল। সাধারণ মহিষের তুলনায় এর গায়ের রং, চুল এবং শারীরিক গঠন ভিন্ন হওয়ায় এটি মানুষের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কোরবানির ঈদের আগে মহিষটি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অবস্থিত ‘রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম’-এ লালন-পালন করা হচ্ছিল। খামারটির মালিক জিয়া উদ্দিন মৃধা এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা মহিষটির অস্বাভাবিক চুল ও চেহারা দেখে এর নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প -এর চুলের স্টাইলের সঙ্গে মিল থাকায় এই নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। নামটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মহিষটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
মে মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মহিষটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর এটি দেশজুড়ে পরিচিতি পায়। পরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও মহিষটির ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংবাদ ও ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
খামার মালিক জিয়া উদ্দিন মৃধা পরবর্তীতে মহিষটি বিক্রি করেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকার বাসিন্দা মনিরুজ্জামানের কাছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মহিষটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
ঈদের আগে ২৫ মে বিকেলে মহিষটিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে প্রশাসনের নজরে এলে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। মহিষটিকে ঘিরে জনসমাগম এবং নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
ঈদের আগের দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে পুলিশ মহিষটিকে মনিরুজ্জামানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে। প্রথমে সেটিকে কেরানীগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। পরে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহিষটির আশ্রয় হয় মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায়।
চিড়িয়াখানায় অবস্থানের সময়ও দর্শনার্থীদের কাছে এটি ছিল অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিদিন বহু মানুষ মহিষটিকে দেখতে আসতেন এবং ছবি তুলতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে শেয়ার হতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালবিনো প্রাণী নিয়ে গবেষণা প্রাণিসম্পদ খাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারে। এ ধরনের প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য, রোগপ্রবণতা এবং প্রজনন সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
বিএলআরআই সূত্র জানায়, কোয়ারেন্টাইন শেষে মহিষটির প্রজনন উপযোগিতা যাচাই করা হবে। এটি গবেষণা কার্যক্রমে কতটা কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে গবেষকদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ মহিষটিকে মূলত মোটাতাজাকরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদে এটিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা এবং গবেষণার উপযোগী করে তোলা সহজ হবে না।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ গবেষণার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এটি প্রাণিসম্পদ খাতে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার গুরুত্বও তুলে ধরবে।
বর্তমানে মহিষটির স্বাস্থ্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। গবেষকরা আশা করছেন, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে এর সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে।
দেশজুড়ে আলোচিত এই মহিষ এখন আর শুধু একটি ভাইরাল প্রাণী নয়; এটি পরিণত হয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে। ফলে আগামী দিনগুলোতে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষকে ঘিরে নতুন তথ্য ও গবেষণার ফলাফল জানার অপেক্ষায় রয়েছেন প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্টরা এবং সাধারণ মানুষ।





























