বিশ্বের বিভিন্ন মানচিত্রে আফ্রিকার আকার একেকভাবে দেখা যায়। প্রচলিত Mercator projection-এ আফ্রিকাকে তার প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক ছোট মনে হতে পারে। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
এই পার্থক্যের মূল কারণ মানচিত্র তৈরির পদ্ধতি। পৃথিবী গোলাকার হলেও কাগজ বা সমতল পর্দায় সেটিকে তুলে ধরতে গিয়ে বিভিন্ন প্রজেকশনে আয়তন ও আকৃতির কিছুটা বিকৃতি ঘটে।
আফ্রিকার মানচিত্র নিয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগ
আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবের পর। ৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘Correct the Map’ নামে একটি প্রস্তাব ১৬৪-১ ভোটে অনুমোদন করে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
প্রস্তাবটিতে প্রয়োজন অনুযায়ী এমন মানচিত্র প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তন আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা যায়।
কেন Mercator মানচিত্রে সমস্যা দেখা যায়?
Mercator projection নৌযাত্রা ও দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এতে বিষুবরেখা থেকে দূরে থাকা অঞ্চলগুলোর আকার তুলনামূলকভাবে বেশি বড় দেখায়।
ফলে উত্তর ও দক্ষিণের উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় বড় মনে হয়। এর বিপরীতে আফ্রিকার মতো বিষুবরেখার কাছাকাছি বিশাল মহাদেশ তুলনামূলকভাবে ছোট দেখাতে পারে।
এই কারণে মানচিত্রটি আফ্রিকার প্রকৃত ভৌগোলিক আয়তন সম্পর্কে মানুষের ধারণায় প্রভাব ফেলতে পারে।
Equal Earth প্রজেকশনে দেখা যাবে ভিন্ন চিত্র
জাতিসংঘের প্রস্তাবে Equal Earth projection-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রজেকশন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বিভিন্ন মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তন তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত থাকে এবং একই সঙ্গে মানচিত্রটি সহজে পড়াও যায়।
আফ্রিকান ইউনিয়নও আগে Equal Earth projection ব্যবহারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। টোগো আগামী ছয় মাসে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য দেশ ও অন্যান্য অঞ্চলের সমর্থকদের সঙ্গে আলোচনা করে এই ধরনের মানচিত্রের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে চায়।
শিক্ষাক্ষেত্রেও আসতে পারে পরিবর্তন
আফ্রিকার মানচিত্রের এই পরিবর্তন শুধু মানচিত্র তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান না সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষা ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ক্যামেরুনের ইউনিভার্সিটি অব ইয়াউন্ডে ওয়ানের অধ্যাপক লিওন-মারি এনকোলো এনজোদোর মতে, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ও অর্থনীতির পাশাপাশি কৌশলগত, ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষাতেও আফ্রিকার সঠিক ভৌগোলিক চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন।
এর ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের মহাদেশের আকার, অবস্থান ও বৈশ্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে আরও বাস্তব ধারণা পেতে পারে।
মানচিত্রের বাইরেও বড় বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু আফ্রিকার আয়তন সঠিকভাবে দেখানোর প্রচেষ্টা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফ্রিকার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও।
তানজানিয়ার দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার বৈদেশিক সংবাদ বিভাগের সম্পাদক বেঞ্জামিন এমগানা মনে করেন, আফ্রিকার দেশগুলো এখন অন্যদের নির্ধারিত বৈশ্বিক এজেন্ডায় শুধু প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি প্রতিনিধিত্ব, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে শক্তিশালী ভূমিকা এবং নিজেদের গল্প নিজেদের মতো করে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষাও এর সঙ্গে যুক্ত।
আফ্রিকার আকার থেকে বিশ্বমঞ্চে কণ্ঠস্বর
একটি মানচিত্র হয়তো শুধু ভৌগোলিক তথ্য দেখায়, কিন্তু সেটি মানুষের মানসিক ধারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন আরও সঠিকভাবে তুলে ধরার উদ্যোগকে অনেকে মহাদেশটির বৈশ্বিক গুরুত্ব নতুনভাবে বোঝানোর একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
মানচিত্রে আফ্রিকা কতটা বড়—এই প্রশ্নের উত্তর বদলানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফ্রিকার কণ্ঠস্বর কতটা শক্তিশালী হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।



























