আফগানিস্তানের শান্তি সংকট এখনো বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘদিনের যুদ্ধ অনেকটাই কমেছে। বড় ধরনের সংঘর্ষ আগের তুলনায় কম দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের জীবন এখনো নানা সংকটে ঘেরা। তাই অনেকেই প্রশ্ন করছেন—শান্তি কি সত্যিই এসেছে, নাকি শুধু যুদ্ধের ধরন বদলেছে?
দীর্ঘ চার দশকের সংঘাতের পর আফগানিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে। অনেক এলাকায় আগের মতো নিয়মিত সশস্ত্র সংঘর্ষ নেই। এতে মানুষের চলাচল তুলনামূলক সহজ হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা ফিরে এলেও অর্থনৈতিক সংকট দূর হয়নি। কর্মসংস্থান কমে গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি এবং লাখো মানুষ এখনো মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক সহায়তার বড় একটি অংশ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি অনেক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। অনেক পরিবার নিয়মিত আয় হারিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়।
বর্তমানে আফগানিস্তানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেকারত্ব। তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। দক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশ বিদেশে চলে গেছে। ফলে বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মীর সংকটও তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলেও মানুষের জীবনযাত্রার মানে বড় পরিবর্তন আসেনি।
নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতের মানবসম্পদ গঠনে বড় ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখলে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
শুধু অর্থনীতি নয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থাও এই সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করে, নারীদের কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনা হলে পরিবারগুলোর আয় বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের উপস্থিতি নিয়ে এখনো আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোও চায়, আফগানিস্তানের ভূখণ্ড যেন কোনো জঙ্গি সংগঠনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল না হয়। এই কারণে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথও কঠিন হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা অনেক বড়। দেশটিতে তামা, লিথিয়াম, লৌহ আকরিক এবং বিরল খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এসব সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্বচ্ছ আইন, উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ। বর্তমানে এই খাতগুলোতে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং ধীরে ধীরে উন্নয়নমূলক সহযোগিতা বাড়ানো। তবে এর সঙ্গে মানবাধিকার, নারীদের শিক্ষা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে দৃশ্যমান অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ আফগানিস্তানের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।
সব মিলিয়ে আফগানিস্তানের শান্তি সংকট এখন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে বড় যুদ্ধ কমলেও মানুষের জীবন এখনো নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে। স্থায়ী শান্তি তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাবে। শুধু সংঘর্ষ কমে যাওয়া নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই হবে প্রকৃত শান্তির সবচেয়ে বড় সূচক।
























