মোংলা বন্দরের পর এবার চট্টগ্রাম বন্দরেও মিথ্যা ঘোষণায় আনা বিলাসবহুল গাড়ির যন্ত্রাংশের চালান আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) দুটি চালান আটক করা হয়। এর মধ্যে একটি চালানে লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের গাড়ির বিভিন্ন অংশ পাওয়া গেছে। কাস্টমসের হিসাবে চালান দুটির শুল্ক-করসহ মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্ম পরিচালক সাগর সেন সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, চালানটি গত ১০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর প্রায় এক মাসেও বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি। পরে নিলামের মাধ্যমে পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার সময় ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিল না থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, জাপান থেকে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনারে ১৬৭ প্যাকেজে মোট ৮ হাজার ১৮ কেজি পণ্য আনা হয়। পণ্যগুলো পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ, গিয়ারবক্স ও ব্যবহৃত পেট্রল ইঞ্জিন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কনটেইনারের ভেতরে তিন স্তরে পণ্য সাজানো ছিল। সামনের দিকে গাড়ির সাধারণ যন্ত্রাংশ রাখার পর সেগুলোর আড়ালে বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখা হয়।
অধিদপ্তর জানায়, চালানটিতে লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি হোন্ডা বি১৮সি টাইপ-আর ইঞ্জিন, ফ্রন্ট হাফ বা হাফ-কাটসহ আরও কিছু যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়। এসব পণ্য ঘোষিত পণ্যের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন। চালানের প্রকৃত পণ্য ও মূল্য যাচাইয়ের কাজও চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঢাকার ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস জাপান থেকে এসব গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে। এর আগে একই আমদানিকারকের মোংলা বন্দর দিয়ে আনা একটি চালান আটক করা হয়েছিল। সেখানেও বিলাসবহুল গাড়ি কয়েকটি অংশে ভাগ করে পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এবার চট্টগ্রাম বন্দরের চালানেও একই ধরনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কাস্টমসের প্রাথমিক হিসাবে লেক্সাস এলএক্স ৬০০-এর বাজারমূল্য ৬ থেকে ৯ কোটি টাকা হতে পারে। লেক্সাস এসসি ৪৩০-এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৫০ থেকে ৯০ লাখ টাকা এবং বিএমডব্লিউ এম৫-এর বাজারমূল্য ৩ থেকে ৮ কোটি টাকা হতে পারে। তবে যন্ত্রাংশগুলোর প্রকৃত মূল্য ও শুল্কযোগ্যতা যাচাই শেষে চূড়ান্ত করা হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কাস্টমস।
সাগর সেন বলেন, চালানে পাওয়া গাড়ির বিভিন্ন অংশ আবার সংযোজন করে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা সম্ভব কি না, তা বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। গাড়ির ধরন অনুযায়ী এসব পণ্যের শুল্ক-কর ১০৩ থেকে ৬২১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আমদানিকারক বা সংশ্লিষ্ট কেউ চালানটি খালাস করতে চাইলে নির্ধারিত শুল্ক-কর ও জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি যাচাই-বাছাইয়ের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে মোংলা বন্দরে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি কয়েকটি অংশে ভাগ করে বা সিকেডি অবস্থায় আনার অভিযোগে চালান জব্দ করা হয়। আমদানির সময় গাড়িগুলোকে পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে কাস্টমস জানায়। শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে এসব গাড়ি জব্দ করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়ির মূল্য এক কোটি টাকার বেশি।
এ ছাড়া একই সময়ে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জের সাত্তার মঞ্জিলের একটি গ্যারেজ থেকেও একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়িটিতে ‘চট্ট মেট্রো-গ ১১-৩৬৫১’ নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছিল। গাড়িটির বাজারমূল্য যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজারের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের পার্কিং এলাকা থেকেও তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়িগুলোর ক্রয় ও আমদানি-সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় সেগুলো জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। প্রাথমিক অনুসন্ধানে শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা, চোরাচালান বা দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে গাড়িগুলো দেশে আনা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।



























