কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ রাখা হয়েছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে। প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত ও বুঝে নিতে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন স্বজনেরা। কিন্তু আগুনে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং আরও ছয়জন দগ্ধ হন। আহত ব্যক্তিদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। বাকি দুজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে কোন মরদেহটি কার, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, আগুনে মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এরপর আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।
এদিকে আগুনের পর থেকে ঢাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি দুই বান্ধবী আইরীন জাহান ও ইসরাত জাহানের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন। আইরীন জাহান জানান, শনিবার ভোরে তাঁরা সূর্যোদয় দেখতে সমুদ্রসৈকতে যান। নাসরিনকে সঙ্গে যাওয়ার কথা বললেও তিনি ঘুমানোর জন্য রিসোর্টেই থেকে যান। পরে ফিরে এসে তাঁরা রিসোর্টে আগুন জ্বলতে দেখেন।
নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল খবর পেয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসেন। তিনি রিসোর্ট ও হাসপাতাল দুই জায়গাতেই স্ত্রীকে খুঁজেছেন। কিন্তু তাঁর সন্ধান পাননি। মরদেহের অবস্থা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি। নাসরিন আশুলিয়ার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন বলে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রিসোর্টের মালিক মো. তানভির ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, হতাহতের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
ঘটনাটি তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল এবং তা অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে একাধিক নোটিশ দিয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরও সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, রিসোর্টটি নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল না। সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।
নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় হাসপাতালে স্বজনদের ভিড় বাড়ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন