মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, নদ-নদী ও সমুদ্রসীমায় নজরদারি বাড়িয়েছে সংস্থাটি। নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৮৩ লাখ ৩০ হাজার ৯০০ মিটার জাল, ১৫৫ কেজি ইলিশ মাছ এবং ১৪টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৪ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
সরকারের ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা গত ৮ অক্টোবর শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে কোস্ট গার্ডের চারটি জোনের অধীন বিভিন্ন স্টেশন ও আউটপোস্ট থেকে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, মা ইলিশ সংরক্ষণে সংস্থাটির আওতাধীন ১৬টি জেলার ৫৪টি উপজেলায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, সন্দেহজনক নৌযানে তল্লাশি এবং নিয়মিত ও বিশেষ টহলের মাধ্যমে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধের চেষ্টা চলছে। চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।
অবৈধ মাছ শিকারে জাল ও নৌকা জব্দ
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে জব্দ করা জাল মৎস্য প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিনষ্ট করা হয়েছে। উদ্ধার করা ইলিশ মাছ স্থানীয় এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। জব্দ করা নৌকাগুলো সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের জলসীমায় প্রতিবেশী দেশের মাছ ধরার ট্রলার প্রবেশ করে অবৈধভাবে মাছ আহরণ করতে না পারে, সে জন্য টহলরত জাহাজগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জেলেদের জন্য খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে সরকার
নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলেদের জীবিকা নির্বাহে যেন অতিরিক্ত সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। দেশের ৩৮ জেলার ১৬৮টি উপজেলার মোট ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৯০টি জেলে পরিবারের জন্য পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে বরিশালে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬, চট্টগ্রামে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯৫ এবং ঢাকায় ৬৫ হাজার ৭১৭ জেলে পরিবার রয়েছে। এ ছাড়া খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলে পরিবারও এ সহায়তার আওতায় রয়েছে।
ভোলার চরফ্যাশনের জেলে বুরহান উদ্দিন বাসসকে বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জেলেরাই উপকৃত হবেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার খাদ্যসহায়তা দেওয়ায় জেলেদের জন্য এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
দুর্গম এলাকায় অবৈধ মাছ ধরা বড় চ্যালেঞ্জ
নদ-নদী ও উপকূলের দুর্গম এলাকায় রাতের আঁধারে গোপনে মাছ ধরা এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা কোস্ট গার্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
অভিযানের পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে কোস্ট গার্ড। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও আলোচনা সভার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়তে পারে এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরী বলেন, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর উদ্যোগ। তবে প্রজনন সুরক্ষা আরও জোরদার করতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ এক মাস করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরও ডিমওয়ালা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়তে দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল ও অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করার কার্যক্রমও চলছে।
নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন বা অবৈধ মাছ শিকারের তথ্য জানাতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে মা ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগ আরও সফল হবে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন