অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। এর ফলে জীবাণুর মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর (AMR) নামে পরিচিত। এই প্রবণতার কারণে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বাড়তে পারে রোগীর হাসপাতালে থাকার সময়, চিকিৎসার ব্যয় এবং মৃত্যুঝুঁকি।

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, ভুল মাত্রায় ব্যবহার কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে। তখন প্রচলিত ওষুধ দিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। এ ধরনের প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াকে অনেক সময় ‘সুপারবাগ’ বলা হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়তে থাকলে নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের চিকিৎসা জটিল হয়ে উঠতে পারে। যক্ষ্মার মতো রোগের ক্ষেত্রেও ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

কোনো সংক্রমণের জীবাণু ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে চিকিৎসককে বিকল্প ওষুধ বেছে নিতে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর ওষুধের সংখ্যা সীমিত হয়ে যায়। ফলে রোগীকে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিতে হয় এবং হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন বাড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি শুধু রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় না, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যয়বহুল ওষুধ, বাড়তি পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসাপদ্ধতিতেও কার্যকর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মানুষের পাশাপাশি পশুপালন ও খাদ্য উৎপাদন খাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার জরুরি। গবাদিপশু ও মাছের রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা অনুপযুক্তভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঘটতে পারে।

এসব জীবাণু পরিবেশ, পানি, খাদ্য এবং প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে খাদ্যের মাধ্যমে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে জীবাণুর ধরন, দূষণের পরিস্থিতি ও সংক্রমণের পথের ওপর। এ কারণে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সংক্রমণ চিকিৎসায় অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

এএমআর-এর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে পরিবার ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রয়ব্যবস্থা, কৃষি এবং পশুপালন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্দি-কাশি বা ফ্লুর মতো ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। তাই এসব অসুস্থতায় নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।

চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিলে নির্দেশিত মাত্রা ও সময়সূচি মেনে চলতে হবে। ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন, অন্যের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কিংবা অবশিষ্ট ওষুধ পরে নিজের মতো করে সেবন করা ঠিক নয়। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বা ওষুধ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ, হাত পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া এবং নিরাপদ খাদ্য ও পানি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ধরে রাখতে সচেতনতা ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। দায়িত্বশীলভাবে ওষুধ ব্যবহার করা গেলে প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার কমানোর প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করা সম্ভব। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ বজায় রাখা সহজ হবে।