ঢাকা ০৫:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার নদীতে প্রতিদিন ৩৩০ টন বর্জ্য ফেলছে ৪২৪টি উৎস

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৪:২৫:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৫

বিভিন্ন ড্রেন ও নির্গমনপথ দিয়ে বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ঢাকার নদীতে। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার নদী দূষণ দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কেজি বা ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য পড়ছে। এসব বর্জ্য ফেলার জন্য মোট ৪২৪টি সরকারি ও বেসরকারি নির্গমনপথ শনাক্ত করা হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, এসব দূষণের প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী শিল্পকারখানা। শনাক্ত হওয়া ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনপথের মধ্যে ২৪৪টি বেসরকারি কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন, গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, তেল ও পোড়া লুব্রিকেন্ট নদীতে গিয়ে পড়ছে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশের নদীতীরে প্রায় ৭ হাজার ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এর প্রায় ৯৯ শতাংশের কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার বা ETP নেই।

নদী দূষণের আরও প্রায় ৩০ শতাংশ আসে বিভিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে। এর মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও স্থানীয় সরকার সংস্থার পরিচালিত ড্রেন রয়েছে। জরিপে ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেন শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো সরাসরি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে যুক্ত। এর মধ্যে ৫৭টি ড্রেন বুড়িগঙ্গায় এবং ৯টি তুরাগে গিয়ে পড়েছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু ড্রেনও নদীগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বুড়িগঙ্গা দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার নদী দূষণের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। নদীর বিভিন্ন অংশে পানির স্বাভাবিক রং হারিয়ে গেছে এবং কখনো কখনো দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যায়। পানিতে অ্যামোক্সিসিলিন, পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশও বিভিন্ন গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নৌযান থেকে পোড়া ইঞ্জিন তেল, লুব্রিকেন্ট, বাজারের পচা খাদ্যবর্জ্য ও প্লাস্টিকও নদীর দূষণ বাড়াচ্ছে।

ঢাকার নদী দূষণ কমাতে সরকার সম্প্রতি নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাই ও আগস্টে একাধিক বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের মাধ্যমে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। ২৬ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা নদীগুলোর পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। শনাক্ত হওয়া উৎসগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের কার্যালয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

পরিবেশকর্মী ও স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নদী দূষণের অন্যতম বড় কারণ। শুধু কয়েকটি বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পুরো ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং খালগুলোর সঙ্গে নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু নদী পরিষ্কার বা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বর্জ্য নির্গমনের প্রতিটি উৎসের মালিকানা চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি এবং শিল্পকারখানায় কার্যকর ETP নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিলেও ঢাকার নদী দূষণের মূল সমস্যা থেকেই যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকার নদীতে প্রতিদিন ৩৩০ টন বর্জ্য ফেলছে ৪২৪টি উৎস

Update Time : ০৪:২৫:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকার নদী দূষণ দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কেজি বা ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য পড়ছে। এসব বর্জ্য ফেলার জন্য মোট ৪২৪টি সরকারি ও বেসরকারি নির্গমনপথ শনাক্ত করা হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, এসব দূষণের প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী শিল্পকারখানা। শনাক্ত হওয়া ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমনপথের মধ্যে ২৪৪টি বেসরকারি কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন, গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, তেল ও পোড়া লুব্রিকেন্ট নদীতে গিয়ে পড়ছে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশের নদীতীরে প্রায় ৭ হাজার ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এর প্রায় ৯৯ শতাংশের কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার বা ETP নেই।

আরও পড়ুন  আমিনবাজারে ময়লা অপসারণে ৩০ দিনের আল্টিমেটাম

নদী দূষণের আরও প্রায় ৩০ শতাংশ আসে বিভিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে। এর মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও স্থানীয় সরকার সংস্থার পরিচালিত ড্রেন রয়েছে। জরিপে ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেন শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো সরাসরি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে যুক্ত। এর মধ্যে ৫৭টি ড্রেন বুড়িগঙ্গায় এবং ৯টি তুরাগে গিয়ে পড়েছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু ড্রেনও নদীগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বুড়িগঙ্গা দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার নদী দূষণের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। নদীর বিভিন্ন অংশে পানির স্বাভাবিক রং হারিয়ে গেছে এবং কখনো কখনো দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যায়। পানিতে অ্যামোক্সিসিলিন, পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশও বিভিন্ন গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নৌযান থেকে পোড়া ইঞ্জিন তেল, লুব্রিকেন্ট, বাজারের পচা খাদ্যবর্জ্য ও প্লাস্টিকও নদীর দূষণ বাড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন  ঈদযাত্রায় গাজীপুর মহাসড়কে বাড়ছে যানবাহনের চাপ

ঢাকার নদী দূষণ কমাতে সরকার সম্প্রতি নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাই ও আগস্টে একাধিক বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের মাধ্যমে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। ২৬ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা নদীগুলোর পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। শনাক্ত হওয়া উৎসগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের কার্যালয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

আরও পড়ুন  বরিশালে পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল ২ স্কুলশিক্ষার্থীর

পরিবেশকর্মী ও স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নদী দূষণের অন্যতম বড় কারণ। শুধু কয়েকটি বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পুরো ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং খালগুলোর সঙ্গে নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু নদী পরিষ্কার বা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বর্জ্য নির্গমনের প্রতিটি উৎসের মালিকানা চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি এবং শিল্পকারখানায় কার্যকর ETP নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিলেও ঢাকার নদী দূষণের মূল সমস্যা থেকেই যাবে।