ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালে আতঙ্ক ও হতাহতের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সোমবার বিকেলে হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। নিচে নামার সময় কয়েকজনের হতাহতের খবর ছড়িয়ে পড়লেও প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পর হাসপাতালের বেশিরভাগ সিঁড়ি বন্ধ থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। কেন সিঁড়িগুলো তালাবদ্ধ ছিল, সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী ছিল কি না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আটতলা থেকে রোগী ও স্বজনরা দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনের চারটি সিঁড়ির মধ্যে মাত্র একটি খোলা ছিল। ফলে একসঙ্গে অনেক মানুষ ওই সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করায় ধাক্কাধাক্কি ও আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়। একটি গেট বন্ধ থাকায় বের হওয়ার পথ নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, শুরুতেই সবগুলো নিরাপদ বের হওয়ার পথ খুলে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারত। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লিফট কন্ট্রোল রুমের কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে যুক্ত বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। অতিরিক্ত উত্তাপও আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে অবশ্য আরও বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের বিভিন্ন অংশের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও আলোচনায় এসেছে।
ঘটনার পর প্রথম দিকে ছয়জনের মৃত্যুর খবর জানানো হলেও পরে সেই তথ্য নিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। হাসপাতালের রেজিস্টারে থাকা কয়েকজনের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, তালিকায় থাকা একজনকে জীবিত পাওয়া গেছে। অন্যদের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা যাওয়ার পর হাসপাতালে আনা হয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায়। বাকি দুজনের মৃত্যুর কারণও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার।
তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যে হুড়োহুড়ির সময় কয়েকজনের পড়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। কুলসুমা নামে এক নারীর স্বজনদের দাবি, আগুনের সময় পরিবারের সদস্যদের বের করে আনতে গিয়ে তিনি সিঁড়িতে পড়ে যান এবং মানুষের চাপের মধ্যে মারা যান। শাহজাহান নামের আরেক ব্যক্তির ছেলে জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিচে নামার সময় পেছন থেকে ধাক্কা লেগে তারা পড়ে যান। এসব বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি তদন্তের ফলাফল মিলিয়ে দেখার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। তাই যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, আগুনের সময়কার পরিস্থিতি, সিঁড়ি ও গেট বন্ধ থাকার বিষয় এবং হতাহতের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে যদি নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা সামনে আসবে। হাসপাতালের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে জরুরি মুহূর্তে পর্যাপ্ত সিঁড়ি, গেট ও বের হওয়ার পথ সচল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা, জরুরি বহির্গমনপথ খোলা রাখা এবং নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্ত প্রতিবেদনেই জানা যাবে, এই ঘটনায় আসলেই কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




























