শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতে দুই দেশের সম্পর্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে স্বাগত জানান। পরে ঢাকায় দায়িত্ব পালনের গত দুই মাসের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী। এ সময় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
সাক্ষাতে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধও ভারতের কাছে পুনর্ব্যক্ত করা হয়। অর্থাৎ বৈঠকে শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুও গুরুত্ব পেয়েছে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বৈঠকের বিষয়টি জানানো হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতিতে এই সাক্ষাৎকে গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীনেশ ত্রিবেদী গত জুনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২৫ জুন রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব শুরু করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটিই ছিল তাঁর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে রোববার বিকেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই দেশের কর্মকর্তারা শুরুতে উপস্থিত থাকলেও পরে দুই দেশের প্রতিনিধিরা একান্তে আলোচনা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। এর আগে ২৯ জুলাইও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ধারাবাহিক এসব বৈঠককে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং স্বার্থের বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। তাঁর মতে, সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে ফেরানোর জন্য আলোচনার বিকল্প নেই। পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে এক দেশের সংবেদনশীলতার প্রতি অন্য দেশের যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের এই বৈঠকের ফলে সামনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন জটিল ইস্যুতে আরও আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ এবং শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ফেরত আনার অনুরোধ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বিষয়েও ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। সেই জায়গা থেকে দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকে কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রত্যাশা, শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ফেরত চাওয়া এবং দুই দেশের সম্পর্ককে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা—সব মিলিয়ে বৈঠকটি কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশের এসব প্রত্যাশার বিষয়ে ভারত কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়। দুই দেশের নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে অগ্রগতি আসে কি না, সেটিই সামনে সবচেয়ে বেশি নজরে থাকবে।




























