সোনাল দিনুশা ভারতকে হতাশ করে শুধু ম্যাচই বাঁচাননি, ব্যাট হাতে গড়েছেন অসাধারণ এক রেকর্ড। কলম্বো টেস্টের শেষ দিনে তাঁর অপরাজিত ১৩৩ রানের ইনিংসে ভর করে শ্রীলঙ্কা নিশ্চিত হার এড়িয়ে ম্যাচ ড্র করেছে। দুই ম্যাচের সিরিজ ভারত ১-০ ব্যবধানে জিতলেও দ্বিতীয় টেস্টে স্বাগতিকদের প্রতিরোধের মূল নায়ক ছিলেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
সোনাল দিনুশার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল তাঁর সুইপ শট। পুরো সিরিজে এই শট থেকে তিনি করেছেন ১৭৬ রান। টেস্ট ক্রিকেটের কোনো সিরিজে একজন ব্যাটসম্যানের সুইপ শট থেকে এত রান করার নজির আগে ছিল না। এর আগে রেকর্ডটি ছিল ইংল্যান্ডের জো রুটের। ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এক সিরিজে সুইপ শট থেকে ১৬৮ রান করেছিলেন রুট। এবার সেই রেকর্ড পেছনে ফেলেছেন দিনুশা।
শুধু রানেই নয়, সুইপ শট খেলার চেষ্টার সংখ্যাতেও নতুন রেকর্ড গড়েছেন তিনি। পুরো সিরিজে ১২১ বার সুইপ শট খেলার চেষ্টা করেন দিনুশা। এর আগে এই তালিকায় সর্বোচ্চ ছিল রুটের ১১৩টি প্রচেষ্টা। অর্থাৎ একই সিরিজে রান এবং শট খেলার চেষ্টার দুই ক্ষেত্রেই নতুন মাইলফলক তৈরি করেছেন শ্রীলঙ্কার এই ব্যাটসম্যান।
কলম্বো টেস্টে দিনুশার পারফরম্যান্স ছিল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১০৩ রান। ভারত ৫০৩ রান তুলে ২১৩ রানের বড় লিড নেওয়ার পর শ্রীলঙ্কাকে ফলো-অন করানো হয়। তখন স্বাগতিকদের সামনে ছিল ম্যাচ বাঁচানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও ব্যাট হাতে দৃঢ়তা দেখান দিনুশা। দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে তিনি অপরাজিত থাকেন ১৩৩ রানে।
শেষ দিনে ভারতের বোলারদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান দিনুশা ও কেশারা নুয়ানথা। সপ্তম উইকেটে দুজনের জুটিতে আসে ১১২ রান। নুয়ানথা ৪৬ রান করে ফিরে গেলেও দিনুশা নিজের জায়গা ধরে রাখেন। ভারতীয় বোলাররা নিয়মিত চাপ তৈরি করলেও তাঁকে ফেরাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ৪২৯ রান করে ইনিংস ঘোষণা না করেই দুই দল ম্যাচ শেষ করতে সম্মত হয়।
শ্রীলঙ্কার এই লড়াইয়ের ফলে ভারতের জয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। প্রথম ইনিংসে ২১৩ রানের লিড নেওয়ার পরও ফলো-অন করানো দল ম্যাচ জিততে পারেনি। শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ২১৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শেষ করে। ভারতের হয়ে মানব সুথার ও রবীন্দ্র জাদেজা তিনটি করে উইকেট নিলেও দিনুশার প্রতিরোধ ভাঙতে পারেননি।
এই সিরিজে দিনুশার সামগ্রিক পারফরম্যান্সও ছিল নজরকাড়া। দুই টেস্টের চার ইনিংসে তিনি করেছেন তিনটি সেঞ্চুরি। প্রথম টেস্টেও তাঁর ব্যাটে এসেছিল শতরান। আর কলম্বো টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করে তিনি বিরল কীর্তি গড়েছেন। ছয় নম্বর বা তার নিচে ব্যাট করে এক সিরিজে তিনটি সেঞ্চুরি করা টেস্ট ইতিহাসের মাত্র কয়েকজন ব্যাটসম্যানের তালিকায় এখন তাঁর নাম।
কলম্বো টেস্টের দুই ইনিংসে শতরান করার ঘটনাটিও বিশেষ। টেস্টের এক ম্যাচে ছয় নম্বর বা তার নিচে ব্যাট করে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন দিনুশা। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসেও তাঁর এই অর্জন আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।
ভারত শেষ পর্যন্ত সিরিজ জিতেছে, কিন্তু কলম্বো টেস্টের আলোচনায় দিনুশার নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। একদিকে জো রুটের সুইপ শটের রেকর্ড ভাঙা, অন্যদিকে টানা সেঞ্চুরি এবং ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস—সব মিলিয়ে নিজের সামর্থ্যের বড় প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন দীর্ঘ সময় ব্যাট করে দলকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
দিনুশার এই পারফরম্যান্স শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের জন্যও ইতিবাচক বার্তা। ২৫ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান এখন থেকেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠতে পারেন। ভারতের বিপক্ষে এই সিরিজ হয়তো শ্রীলঙ্কার জয় এনে দেয়নি, তবে দিনুশার ব্যাটে পাওয়া নতুন রেকর্ড এবং আত্মবিশ্বাস তাদের ক্রিকেটে বড় প্রেরণা হয়ে থাকবে।


























