চট্টগ্রামের পটিয়ার দক্ষিণ গোবিন্দারখীলে একসময় বাঁশের বেড়া ও জং ধরা টিনের চালার ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে বাস করত সাজ্জাদ হোসেনের পরিবার। বৃষ্টি হলে সেই ঘরের টিনের চাল চুইয়ে পানি পড়ত, আর পরিবারের সবাইকে এক কক্ষে গাদাগাদি করে রাত কাটাতে হতো। সেই অভাবের সংসার থেকে উঠে এসে কেবল নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে জায়গা করে নিয়েছেন সাজ্জাদ। দারিদ্র্য, অনিয়মিত অনুশীলন ও নানা বাধা পেরিয়ে ক্লাব ফুটবলে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন ৩১ বছর বয়সী এই অ্যাথলেট। ফুটবলের কল্যাণে আজ তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে এবং জরাজীর্ণ সেই কুঁড়েঘরের জায়গায় নিজের উপার্জিত প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন দোতলা পাকা বাড়ি। পরিপাটি সেই বাড়িতে এখন থরে থরে সাজানো আছে তাঁর অর্জিত বিভিন্ন খেলার ক্রেস্ট, সনদ ও জার্সি।
সাজ্জাদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে। দিনমজুর বাবা কবির আহমদের সামান্য আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো বেশ কঠিন ছিল, এমনকি অনেক দিন পরিবারের সবার ঠিকমতো খাবারও জুটত না। অভাবের কারণে পড়াশোনার ফাঁকে বড় ছেলে হিসেবে সাজ্জাদকেও কখনো বাবার সঙ্গে, আবার কখনো বড় ভাইদের সঙ্গে দিনমজুরের কাজে যেতে হতো। পটিয়া মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়া শেষ করে এ এস রাহাত আলী উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তির পর ফুটবলের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। টিফিনের ছুটিতে পাশের পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে বড়দের অনুশীলন দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতেন তিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে মিলে কেনা একটি ফুটবল দিয়েই মূলত তাঁর স্বপ্নের হাতেখড়ি হয়।
ফুটবলে একটু একটু করে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক চেষ্টা শুরু হয় ২০০৬ সালের দিকে। বন্ধুদের নিয়ে ‘পটিয়া জুনিয়র স্পোর্টিং ক্লাব’ গঠন করে স্থানীয় বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলা শুরু করেন এবং মানুষের প্রশংসা কুড়ান। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে ভর্তি হলেও আর্থিক অনটনের কারণে নিয়মিত অনুশীলনে যাওয়া সম্ভব হতো না। কখনো কাজে যেতে হতো, আবার কিছুদিন একটি এনজিওতেও চাকরি করেছিলেন। সেই কঠিন সময়ে স্থানীয় সমাজসেবক হাজী মোহাম্মদ নবী সওদাগর তাঁকে একজোড়া বুট কিনে দিয়ে দারুণ অনুপ্রেরণা জোগান। তবে তাঁর ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন পটিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ টি এম মুহিবুল্লাহ চৌধুরী, যিনি ২০১০ সালে তাঁকে ডেকে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি নাশতার টাকাও দিতেন।

এরপর সাজ্জাদের ফুটবলজীবনের প্রথম বড় বাঁকটি আসে ২০১২ সালে। বিকেএসপির উদ্যোগে পটিয়ায় উপজেলা পর্যায়ের খেলোয়াড় বাছাইয়ে অংশ নেওয়া দেড় শতাধিক কিশোরের মধ্যে নির্বাচিত পাঁচজনের একজন হন তিনি। পরে চট্টগ্রাম জেলা ও বিভাগীয় দলেও জায়গা করে নেন এবং প্রবীণদার হাত ধরে ‘চট্টগ্রাম পাইওনিয়ার ব্লু স্টার’-এর হয়ে খেলার সুযোগ পান। কয়েক বছর পটিয়া উপজেলা দল ও ঢাকার কদমতলা সংসদের হয়ে খেলার পর ২০১৬ সালে তাঁর জীবনে বড় সুযোগটি আসে। চট্টগ্রাম আবাহনী ও পটিয়া উপজেলা দলের মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচে তাঁর দুর্দান্ত খেলা তৎকালীন চট্টগ্রাম আবাহনীর ম্যানেজার আরমান আজিজের নজর কাড়ে। তাঁর মাধ্যমেই মূলত সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পেশাদার লিগের বড় মঞ্চে পা রাখেন সাজ্জাদ।
সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে পাঁচ বছর দাপটের সঙ্গে খেলার পর ২০২১-২২ মৌসুমেও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রতিভা প্রমাণ করেন তিনি এবং বর্তমানে ঢাকার রহমতগঞ্জ এমএফসি ক্লাবে খেলছেন। এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় অর্জনটি আসে ২০২২ সালে, যখন ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর অভিষেক হয়। জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার সঙ্গেও সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে দীর্ঘ সময় খেলেছেন তিনি। ডেনমার্ক থেকে মুঠোফোনে জামাল ভূঁইয়া জানান, সাজ্জাদ অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দুর্দান্ত মানের একজন খেলোয়াড়, যিনি মাঠে দলকে শতভাগ উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং গোল করার জন্য সবসময় মরিয়া থাকেন।
এই অসামান্য সাফল্যের পেছনে সাজ্জাদ সবচেয়ে বেশি স্মরণ করেন তাঁর প্রয়াত বাবা কবির আহমদকে, যিনি চাইতেন ছেলে পড়াশোনা করে ভালো চাকরি পাক। ২০১৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর ফুটবলই হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারের হাল ধরার একমাত্র মাধ্যম এবং সেই উপার্জনেই তিনি ছোট ভাইয়ের জন্য পটিয়ায় একটি গ্রিল ওয়ার্কশপের দোকান করে দিয়েছেন। একসময় এলাকার অনেকেই বলত ফুটবল খেলে জীবনে কিছুই করা যাবে না, যা শুনে তাঁর মা হতাশ হলেও সাজ্জাদের অদম্য জেদ দেখে সবসময় উৎসাহ দিতেন। নিজের দোতলা বাড়িতে বসে সাজ্জাদ জানান, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দমে যাননি। তিনি বিখ্যাত সেই উক্তিটি হৃদয়ে ধারণ করতেন— ‘যদি উড়তে না পারো দৌড়াও, দৌড়াতে না পারলে হাঁটো, হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দাও, কিন্তু কখনো থেমো না।’



























