মক্কা চুক্তি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বৃহস্পতিবার জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে বৈঠকের সময় চিঠিটি হস্তান্তর করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। চুক্তির মূল বিষয় হলো, তিন দেশের যেকোনো একটি সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই সমঝোতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, এই চুক্তিকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে বাংলাদেশ এতে যোগ দেবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো সামনে আসেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নির্ভর করবে চুক্তির সদস্য দেশগুলোর ভবিষ্যৎ অভিপ্রায়ের ওপর। অর্থাৎ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করলে তখন বিষয়টি নিয়ে ঢাকা নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করবে।
এদিকে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। উভয় পক্ষ সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বৈঠকে জানান, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের সফর হয়েছে। এসব সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উচ্চপর্যায়ের সফরের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, সৌদি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার অংশীদার। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী সৌদি আরবে কাজ করছেন। বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশটির উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানেরও প্রশংসা করেন।
বৈঠকের সময় হুমায়ুন কবির সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ আরও বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
মক্কা চুক্তির বিষয়টি অবশ্য শুধু বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্কের নিরাপত্তা সহযোগিতাও। চুক্তিটি ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে অন্য দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার বিধান রাখা হয়েছে।
এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে চুক্তির সদস্য করার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এসেছে—এমন তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে এ মুহূর্তে ঢাকার পক্ষ থেকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নও আসছে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বিষয়টিকে মুসলিম বিশ্বের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, চুক্তিটি যদি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হয় এবং সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় জানায়, তাহলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিক থেকেও বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। তাই কোনো আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগে এর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব বিবেচনা করা স্বাভাবিক।
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি সৌদি যুবরাজের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের আলোচনায় নতুন মাত্রা এসেছে। চিঠির বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। তবে একই সময়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ায় বিষয়টির গুরুত্ব বেড়েছে।
ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিশেষ পরিষদের বৈঠককে কেন্দ্র করে জেদ্দায় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগও চলছে। সেই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। ফলে দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর পাশাপাশি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হয় এবং বাংলাদেশকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি এবং জেদ্দার বৈঠক থেকে স্পষ্ট যে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।



























