কর্মক্ষেত্রে প্রোডাক্টিভিটি এখন শুধু একটি শব্দ নয়, বরং সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। একই অফিসে বা একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও সবাই সমান ফলাফল করতে পারেন না। কেউ খুব অল্প সময়েই কাজ শেষ করে ফেলে, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না। এর মূল পার্থক্য তৈরি হয় কাজের ধরন, সময় ব্যবস্থাপনা এবং ফোকাসের কারণে।
অনেকেই মনে করেন, সারাদিন ডেস্কে বসে থাকলেই বুঝি প্রচুর কাজ হয়ে যায়। বাস্তবে কিন্তু ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। স্মার্টভাবে পরিকল্পনা করে কাজ করাই আসল প্রোডাক্টিভিটি। তাই কর্মক্ষেত্রে নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
মাল্টিটাস্কিং কমিয়ে একসাথে একটি কাজ করুন
একসাথে অনেক কাজ করলে সময় বাঁচে, এমন ধারণা অনেকের মধ্যে আছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, একসাথে কয়েকটি কাজ করলে মস্তিষ্কের ফোকাস কমে যায়। ফলে কাজের মান খারাপ হয় এবং সময়ও বেশি লাগে।
যখন আপনি একটি কাজ শেষ না করেই আরেকটি কাজে চলে যান, তখন ব্রেইন বারবার ফোকাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এতে মানসিক ক্লান্তি বাড়ে এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তাই কর্মক্ষেত্রে প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে চাইলে একসাথে একটি কাজ শেষ করার অভ্যাস তৈরি করুন। এতে কাজ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হবে।
প্রতিদিনের কাজের তালিকা তৈরি করুন
দিন শুরু করার আগে যদি আপনার কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে, তাহলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এজন্য টু-ডু লিস্ট তৈরি করার অভ্যাস খুব কার্যকর।
রাতে ঘুমানোর আগে পরদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো লিখে রাখতে পারেন। কোন কাজ আগে করবেন, কোনটি পরে করবেন তা নির্ধারণ করলে সময় নষ্ট কম হয়। এছাড়া কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তালিকা থেকে সেটি কেটে দিলে মানসিকভাবে এক ধরনের সন্তুষ্টি কাজ করে। এটি নতুন কাজের প্রতি মোটিভেশন বাড়ায়।

সময় ভাগ করে কাজ করুন
সব কাজের গুরুত্ব এক রকম নয়। তাই প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ধরুন, কোনো রিপোর্ট তৈরি করতে ১ ঘণ্টা লাগবে, আবার ইমেইল চেক করতে লাগবে ১৫ মিনিট। এভাবে সময় ভাগ করে কাজ করলে আপনি বুঝতে পারবেন কোন কাজে কত সময় ব্যয় হচ্ছে।
এই পদ্ধতিকে টাইম ব্লকিংও বলা হয়। এটি আপনার কাজের গতি বাড়াতে সাহায্য করবে এবং অপ্রয়োজনীয় সময় অপচয় কমাবে।
কাজের মাঝে ছোট বিরতি নিন
একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করলে মনোযোগ কমে যায়। এজন্য কাজের মাঝে ছোট বিরতি নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি ২৫ থেকে ৩০ মিনিট পর ৫ মিনিটের বিরতি নিতে পারেন। এই সময় একটু হাঁটাহাঁটি করুন, পানি পান করুন অথবা চোখকে বিশ্রাম দিন।
ছোট বিরতি আপনার মস্তিষ্ককে রিফ্রেশ রাখে এবং নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত বিরতি নেওয়া যাবে না, কারণ এতে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
নিজের কাজ নিজেই রিভিউ করুন
কাজ শেষ করার পর সেটি একবার নিজে যাচাই করা খুব প্রয়োজন। কারণ নিজের ভুল সবচেয়ে ভালোভাবে আপনি নিজেই ধরতে পারবেন।
কাজ রিভিউ করার সময় দেখুন কোথাও কোনো তথ্য বাদ গেছে কি না, ভাষাগত ভুল আছে কি না বা আরও উন্নতির সুযোগ আছে কি না।এই ছোট অভ্যাসটি আপনার কাজের মান অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি সহকর্মী ও কর্তৃপক্ষের কাছেও আপনি একজন দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে পরিচিত হবেন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন
শুধু কাজ করলেই হবে না, শরীর ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়াও জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং কাজের গতি কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ভালো ঘুম মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। ঘুমের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবারও প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন
কাজের সময় অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার প্রোডাক্টিভিটির বড় শত্রু। প্রতি কয়েক মিনিট পর ফোন চেক করার অভ্যাস আপনার ফোকাস নষ্ট করে দেয়।
বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়। তাই কাজের সময় মোবাইল নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা ভালো। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন। এতে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে।
ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করুন
কাজের পরিবেশও প্রোডাক্টিভিটির ওপর বড় প্রভাব ফেলে। অগোছালো ডেস্ক, অতিরিক্ত শব্দ বা নেতিবাচক পরিবেশ কাজের মনোযোগ কমিয়ে দেয়।
নিজের ডেস্ক পরিষ্কার রাখুন। প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখুন। কাজের জায়গায় পর্যাপ্ত আলো ও আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করুন। একটি সুন্দর ও গোছানো পরিবেশ আপনাকে কাজের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলবে।

নিজেকে মোটিভেটেড রাখুন
প্রোডাক্টিভ থাকতে হলে নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। আপনি কেন কাজ করছেন এবং কী অর্জন করতে চান, সেটি সবসময় মনে রাখুন।
ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং লক্ষ্য পূরণ হলে নিজেকে পুরস্কৃত করুন। এটি মানসিকভাবে আপনাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
কর্মক্ষেত্রে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো কোনো কঠিন কাজ নয়। ছোট ছোট কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলেই কাজের গতি ও দক্ষতা অনেক বাড়ানো সম্ভব।
মাল্টিটাস্কিং কমানো, পরিকল্পনা করে কাজ করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং নিজের কাজ নিয়মিত রিভিউ করার মতো অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে আপনাকে আরও সফল ও দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলবে।প্রতিদিন অল্প অল্প করে পরিবর্তন আনুন। দেখবেন, সময়ের সঙ্গে আপনার কাজের মান এবং আত্মবিশ্বাস দুটোই বেড়ে গেছে।

























