স্কুল থেকে ফিরে অনেক শিশুই পড়ার টেবিলে বসতে চায় না। কেউ হোমওয়ার্ক এড়িয়ে যায়, আবার কেউ মোবাইল ফোন, টেলিভিশন বা খেলাধুলার প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখায়। এ নিয়ে অনেক অভিভাবক দুশ্চিন্তায় পড়েন এবং কখনও বকাঝকা বা জোর করে সন্তানকে পড়তে বসানোর চেষ্টা করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন আচরণ শিশুর শেখার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। বরং কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে শিশুর মধ্যেই পড়াশোনার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর একটি শিশু মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত থাকে। তাই বাসায় ফিরেই তাকে পড়ার চাপ না দিয়ে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি খেলাধুলা, শরীরচর্চা বা পছন্দের কোনো কাজে সময় কাটানোর সুযোগ পেলে তার মানসিক চাপ কমে যায়। এরপর নির্ধারিত সময়ে পড়তে বসলে সে তুলনামূলক বেশি মনোযোগী হতে পারে।
নিয়মিত একই সময়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে বসলে শিশুর মধ্যে একটি রুটিন তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে এটি তার স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এতে পড়াশোনাকে আলাদা কোনো চাপ হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। এই অভ্যাস ভবিষ্যতেও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
শুধু মুখস্থ করানোর পরিবর্তে পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গল্প, ছবি, ভিডিও বা বাস্তব জীবনের উদাহরণ ব্যবহার করে কোনো বিষয় শেখালে শিশুর আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। এতে সে সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারে এবং দীর্ঘ সময় মনে রাখতে সক্ষম হয়। শেখার আনন্দ থাকলে পড়াশোনা আর বিরক্তিকর মনে হয় না।
একটানা দীর্ঘ সময় পড়ার পরিবর্তে ছোট ছোট ভাগে পড়ানো বেশি কার্যকর। একটি অধ্যায় বা বিষয় শেষ হলে কয়েক মিনিট বিরতি দেওয়া যেতে পারে। এই বিরতির সময় ছবি আঁকা, ধাঁধার সমাধান, বই পড়া বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হলে শিশুর একঘেয়েমি কমে। একই সঙ্গে মোবাইল বা টেলিভিশনের ওপর নির্ভরশীলতাও ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শিশুকে শেখানো বিষয় নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। সে যদি বিষয়টি অন্য কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারে, তাহলে বোঝা যাবে সে সত্যিই বিষয়টি আয়ত্ত করেছে। পাশাপাশি নিয়মিত লিখে অনুশীলনের অভ্যাস গড়ে তুললে শেখা আরও স্থায়ী হয়। এতে পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপও অনেকটাই কমে যায়।
শিশুর ভালো ফলাফলের পাশাপাশি তার চেষ্টা, পরিশ্রম এবং প্রতিদিনের অগ্রগতিরও প্রশংসা করা প্রয়োজন। শুধু নম্বরকে গুরুত্ব দিলে অনেক শিশু আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তার ছোট ছোট সফলতাকে স্বীকৃতি দিলে শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং ব্যর্থতার ভয়ও কমে যায়। ইতিবাচক উৎসাহ একটি শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পড়াশোনার জন্য শান্ত ও ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ শিশুর মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে বরং তার পাশে থাকা, কথা শোনা এবং মানসিক সমর্থন দেওয়াই একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কারণ শুধু ভালো ফলাফল নয়, শেখার প্রতি ভালোবাসা, আত্মবিশ্বাস এবং কৌতূহলই একটি শিশুর সফল ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।





























