যাত্রীদের ফেরিতে ওঠানোর আগে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার নিরাপত্তা বিধান কার্যকর থাকায় রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে একটি বাস পড়ে যাওয়ার ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। শুক্রবার দুপুরে মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় বলা হয়, নতুন নিরাপত্তা নিয়মের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পাবলিক রিলেশন অফিসার কাজী আরিফ বিল্লাহ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ফেরিতে যানবাহন ওঠানোর আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ফলে বাসটি নদীতে পড়ে গেলেও কোনো যাত্রী হতাহত হননি।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ফেরিঘাটে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন ফেরিতে ওঠানোর আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুক্রবারের ঘটনায় এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের একটি নন-এসি বাস দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরিঘাটে পৌঁছায়। পরে বাসটি ‘করবী’ নামের ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছনের র্যাম্প বা ডালা ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। একপর্যায়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে গাড়িটি পেছনের অংশের দিকে সরে যায়। এরপর ফেরির র্যাম্প ভেঙে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই ফেরিঘাট এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজন, ঘাটকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তবে বাসের ভেতরে কোনো যাত্রী না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়।
ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ডুবুরি ইউনিট উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। সমন্বিতভাবে পরিচালিত এ অভিযানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
উদ্ধার অভিযানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। দুর্ঘটনার কিছু সময়ের মধ্যেই জাহাজটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। এরপর বাসটির অবস্থান নির্ধারণ করে সেটিকে পানির নিচ থেকে তুলে আনার চেষ্টা শুরু হয়।
উদ্ধারকর্মীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে টানা অভিযান পরিচালনা করেন। নদীর স্রোত, পানির গভীরতা এবং বাসটির অবস্থান উদ্ধার কার্যক্রমকে কিছুটা জটিল করে তোলে। তারপরও তারা ধৈর্যের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যান।
অবশেষে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ নদীতে তলিয়ে যাওয়া বাসটি টেনে তুলতে সক্ষম হয়। বাসটি উদ্ধার হওয়ার পর স্বস্তি ফিরে আসে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হওয়া যায় যে বাসটির ভেতরে কোনো যাত্রী ছিল না।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাসটির যাত্রীরা ফেরিতে ওঠার আগেই যানবাহন থেকে নেমে গিয়েছিলেন। তারা পায়ে হেঁটে ফেরির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এই কারণেই বাস নদীতে পড়ে গেলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
ঘাট এলাকায় উপস্থিত কয়েকজন যাত্রী জানান, নতুন নিয়ম অনুসারে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর তারা ফেরিতে ওঠার জন্য হাঁটছিলেন। হঠাৎ পেছনে চিৎকার শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন বাসটি নদীতে পড়ে গেছে। ঘটনাটি তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও পরে সবাই নিরাপদ আছেন জেনে স্বস্তি ফিরে আসে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এবং শত শত যানবাহন এই ঘাট ব্যবহার করে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ঘাটতি থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বলছে, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ২৫ মার্চ একই ঘাটে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা ঘটে। দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে একটি বাস নদীতে পড়ে গেলে অন্তত ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ওই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
মার্চের দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। তদন্তে দেখা যায়, বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। এরপর থেকেই ফেরিতে ওঠার আগে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের মতে, শুক্রবারের ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে সেই সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল। যদি বাসের ভেতরে যাত্রীরা অবস্থান করতেন, তাহলে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারত। নিরাপত্তা বিধান কার্যকর থাকায় একটি সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
ঘটনার পর ঘাট এলাকায় কোনো নিখোঁজ যাত্রীর স্বজনদের ভিড় দেখা যায়নি। কাউকে কান্নাকাটি বা আহাজারি করতেও দেখা যায়নি। এটি নিশ্চিত করে যে বাসটিতে যাত্রী না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।
স্থানীয় প্রশাসন এবং নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছেন। কী কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল এবং র্যাম্প ভেঙে নদীতে পড়ে গিয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় সুপারিশও দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার নিয়মই নয়, ফেরির র্যাম্পের সক্ষমতা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চালকদের সতর্কতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে আরও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নদীপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিয়মিত তদারকির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের সর্বশেষ এই ঘটনায় প্রাণহানি না ঘটলেও এটি আবারও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে। যাত্রী নামানোর বাধ্যতামূলক নিয়ম কার্যকর থাকায় একটি সম্ভাব্য বড় ট্র্যাজেডি এড়ানো গেছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




























