রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দীর্ঘ দুই বছর পর চীনের সঙ্গে থমকে থাকা বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত অর্থায়নের গতি ফেরাতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা। আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীনে নিজের প্রথম সরকারি সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে বেশ কয়েকটি বড় মেগা প্রকল্প ও উন্নয়ন খাতের জন্য চীনের কাছে প্রায় ৬ বিলিয়ন (৬০০ কোটি) ডলারের বিশাল অর্থায়ন চাইতে পারে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এই সফরেই চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৬ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব ও মেগা প্রকল্প
পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরে দুই দেশের মধ্যে ডজনখানেক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাওয়া হবে।
এ ছাড়া জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, রাজশাহীতে পানি শোধনাগার এবং ৪টি জাহাজ কেনার জন্য আরও ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব করা হতে পারে। পাশাপাশি চীনের অনুদানে ১ হাজার শয্যার ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ নির্মাণ ও তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়েও আলোচনা হবে। একই সঙ্গে চলমান চীনা ঋণের সুদের হার কমানো ও গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানোর অনুরোধ জানাবে ঢাকা।
‘সামার দাভোস’ ও শীর্ষ বৈঠক
মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষ করে ২৩ জুন চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভা ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস ২০২৬’ (সামার দাভোস)-এ যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তিনি। সফরে চেরি, হোন্ডা ও চায়নাটেক্সের মতো বৈশ্বিক জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য ও জিডিআই প্রসঙ্গ
সফরে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে যুক্ত চীনের প্রধান উন্নয়ন রূপরেখা ‘জিডিআই’-এ বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিলেও বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অর্থ ও প্রযুক্তির প্রয়োজনে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে যাচ্ছে।
তবে এই সফরকে ঘিরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন, ভারত ও পাশ্চাত্যের মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভূরাজনৈতিক সমীকরণও মেলানো হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির কিছু শর্ত এবং এই সফরের আগেই ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া সফরের আমন্ত্রণ—সব মিলিয়ে ঢাকাকে এক চরম কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ২৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় রপ্তানি বাজার ও ভারতের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে দর-কষাকষি করতে হবে।



























