ইরানকে লক্ষ্য করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া পারমাণবিক হামলার হুমকি ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তেহরান এই বক্তব্যকে শুধু উসকানিমূলকই নয়, বরং “অদ্ভুত বৈপরীত্যপূর্ণ” বলেও মন্তব্য করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, শান্তির দাবি করে একইসঙ্গে ভয়াবহ হামলার হুমকি দেওয়া বিশ্ব রাজনীতিতে বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, যারা একদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে এবং পারমাণবিক সংকট ঠেকানোর দাবি করে, তারাই আবার অন্যদিকে একটি দেশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছে। এই অবস্থানকে তিনি দ্বিচারিতা হিসেবে তুলে ধরেন। নিজের বক্তব্যের সঙ্গে ইসমাইল বাঘাই ১৯৬৪ সালের বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ’-এর একটি অংশও যুক্ত করেন। স্ট্যানলি কুবরিক পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে ভুল বোঝাবুঝি ও সামরিক উন্মাদনার কারণে কীভাবে পারমাণবিক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা ব্যঙ্গাত্মকভাবে দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রটির উল্লেখ করে ইরান মূলত বোঝাতে চেয়েছে, বিশ্ব রাজনীতিতে দায়িত্বহীন বক্তব্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে কড়া মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা ব্যর্থ হলে বিশ্ব এমন বড় ধরনের বোমা হামলা দেখতে পারে, যা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ দিকে নিয়ে যাবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের এমন বক্তব্য নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তুলে ধরতেই ট্রাম্প কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন। তবে এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য তারা পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালে ইরানের সঙ্গে হওয়া আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। এরপর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার প্রভাব দেশটির অর্থনীতিতে গভীরভাবে পড়ে।
ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে পারমাণবিক চুক্তির বিভিন্ন শর্ত মানা থেকে সরে আসে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এতে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যেই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গাজা যুদ্ধ, লোহিত সাগরে উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে পুরো অঞ্চল এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে পারমাণবিক হামলার মতো বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যেকোনো ধরনের হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এমন বক্তব্য শুধু সংশ্লিষ্ট দুই দেশের মধ্যেই উত্তেজনা বাড়ায় না, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। ফলে বিশ্বনেতাদের আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা। ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যকে “ভয় দেখানোর রাজনীতি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একইসঙ্গে ইরানি নেতারা বলছেন, বাহ্যিক চাপ বা সামরিক হুমকির কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোর বদলে আলোচনার পথ খোলা রাখা উচিত। তাদের মতে, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধ বা সামরিক হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে আগ্রাসী রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, আবার সমর্থকরা বলছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্বজুড়ে এই মন্তব্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কারণে এমন বক্তব্য নতুন কিছু নয়। তবুও পারমাণবিক হামলার মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ প্রকাশ্যে তুলে ধরা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। ফলে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের অবস্থান কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
আলজাজিরা থেকে সংগৃহীত।



























