বার্সেলোনা ও স্পেন জাতীয় দলের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল এখন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার। মাঠে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স যেমন প্রশংসা কুড়াচ্ছে, তেমনি মাঠের বাইরেও পরিবারকে নিয়ে তাঁর আবেগঘন কথাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে লাখো মানুষের হৃদয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে লামিন ইয়ামালের শৈশব এবং তাঁর দাদি ফাতিমার অসাধারণ সংগ্রামের গল্প নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ট্রফির চেয়ে পরিবারের সুখই বড় ইয়ামালের কাছে
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন ইয়ামাল। তবে তাঁর মতে, জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ট্রফি নয়; বরং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। ছোটবেলায় যেসব কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁকে বড় হতে হয়েছে, এখন সেই অভাব যেন তাঁর পরিবারের আর না থাকে—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
বার্সেলোনার যুব একাডেমি লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা ইয়ামাল বড় হয়েছেন কাতালোনিয়ার মাতারোর শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায়। এখনও গোল করার পর নিজের বিখ্যাত হাতের ইশারায় এলাকার পোস্টাল কোড তুলে ধরেন তিনি। এতে তিনি শৈশবের সেই এলাকাকে সম্মান জানান, যেখানে তাঁর ফুটবল ও জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
এক পডকাস্টে ইয়ামাল বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান যখন দেখেন তাঁর মা সুখে আছেন, ছোট ভাই সেই সুন্দর শৈশব পাচ্ছে যা তিনি কখনও পাননি। একই সঙ্গে তাঁর বাবা ও দাদিকে নিশ্চিন্তে জীবন কাটাতে দেখাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
দাদি ফাতিমার ত্যাগ
ইয়ামালের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক চরিত্র তাঁর পিতৃকূলের দাদি ফাতিমা। পরিবারের জন্য উন্নত ভবিষ্যতের আশায় তিনি একাই মরক্কো থেকে স্পেনে পাড়ি জমান। কোনো বিলাসবহুল যাত্রা নয়, বরং নানা ঝুঁকি নিয়ে বাসে করে সীমান্ত পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছান স্পেনের মাতারো শহরে।
সেখানে পৌঁছেই তিনি একাধিক কাজ শুরু করেন। সকাল, দুপুর, রাত—যে সময়ই কাজ পাওয়া যেত, তিনি কাজ করতেন। লক্ষ্য ছিল একটাই—মরক্কোয় থাকা নিজের ছেলে ও মেয়েকে স্পেনে নিয়ে আসা। দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের পর প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করে তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও স্পেনে নিয়ে আসেন।
ইয়ামাল বলেন, তাঁর দাদির সেই ত্যাগই আজ তাঁদের পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। বর্তমানেও রোকাফোন্দায় যে বাড়িতে তাঁর দাদি থাকেন, সেটি কিনে দিয়েছেন ইয়ামাল নিজেই।
সংগ্রামে কেটেছে শৈশব
ইয়ামালের মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে ছোটবেলায় স্পেনে আসেন। পরে বার্সেলোনায় তাঁর বাবা-মায়ের পরিচয় হয়। খুব অল্প বয়সেই বাবা-মা হওয়ার কারণে তাঁদের জীবন সহজ ছিল না।
ইয়ামাল জানান, শৈশবে তাঁরা এমন এক আবাসনে থাকতেন, যেখানে অন্য তরুণ বাবা-মায়েরাও থাকতেন। সেখানেই সবাই মিলে খাবার খেতেন এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই দিন কাটত। অনেক সময় বন্ধু বা পরিচিতদের বাড়ির একটি ছোট কক্ষে থেকেও জীবন চালাতে হয়েছে তাঁদের।
পরে তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে বাবা দাদির সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। অন্যদিকে ইয়ামাল মায়ের সঙ্গে গ্রানোলার্সে চলে যান। জীবনের সেই কঠিন সময়গুলো তাঁকে আরও পরিণত করেছে বলেই মনে করেন তিনি।
আজ কোটি ভক্তের ভালোবাসা পেলেও নিজের অতীত ভুলে যাননি ইয়ামাল। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর পরিবারের ত্যাগ ও সংগ্রামই তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। তাই সাফল্যের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি উৎসর্গ করেন মা, বাবা, দাদি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের।




























