প্রতিদিনের খাবারে মুরগির মাংস অন্যতম জনপ্রিয় প্রোটিনের উৎস। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে—দেশি মুরগি নাকি পোল্ট্রি (ব্রয়লার), কোনটি বেশি পুষ্টিকর? পুষ্টিবিদদের মতে, দুটি মুরগির মাংসই শরীরের জন্য উপকারী। তবে কম চর্বি, তুলনামূলক বেশি লোহা, ভিটামিন বি-১২ এবং ওমেগা-৩ থাকার কারণে দেশি মুরগি পুষ্টিগতভাবে কিছুটা এগিয়ে। যদিও নিরাপদ ও সঠিকভাবে পালন করা ব্রয়লার মুরগিও স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুরগির খাবার, পালন পদ্ধতি এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশের কারণে দেশি ও ব্রয়লার মুরগির পুষ্টিগুণে কিছুটা পার্থক্য তৈরি হয়। তাই শুধু জাত নয়, মুরগির উৎস ও উৎপাদন ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশি ও ব্রয়লার মুরগির পুষ্টিগুণের পার্থক্য
পুষ্টিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম রান্না করা মুরগির মাংসে পুষ্টিগুণের পার্থক্য কিছুটা এ রকম—
- ব্রয়লার মুরগি
- ক্যালোরি: ১৬৫–১৯০
- প্রোটিন: ২৭–৩১ গ্রাম
- চর্বি: ৭–১২ গ্রাম
- দেশি মুরগি
- ক্যালোরি: ১৪০–১৭০
- প্রোটিন: ২৫–২৯ গ্রাম
- চর্বি: ৪–৮ গ্রাম
- লোহা, ভিটামিন বি-১২ ও ওমেগা-৩ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
কেন দেশি মুরগিকে কিছুটা এগিয়ে ধরা হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি মুরগি ধীরে ধীরে বড় হয় এবং বেশি চলাফেরা করে। ফলে এর পেশি তুলনামূলক শক্ত ও ঘন হয়। এতে প্রোটিনের গুণগত মান কিছু ক্ষেত্রে ভালো হতে পারে, যা—
- পেশি গঠনে সহায়তা করে।
- ক্ষত দ্রুত সারাতে সাহায্য করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
- দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি ভালো?
হার্টের স্বাস্থ্যের দিক থেকেও দেশি মুরগি কিছুটা এগিয়ে বলে মনে করেন পুষ্টিবিদরা।
এর কারণ হলো—
- এতে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম।
- উপকারী ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকতে পারে।
- খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে।
- শরীরের প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখে।
- হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগি যদি চামড়াসহ খাওয়া হয়, তাহলে চর্বি ও ক্যালোরির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
লোহা ও ভিটামিনের দিক থেকে পার্থক্য
দেশি মুরগিতে লোহা, জিঙ্ক এবং ভিটামিন বি-১২ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
এসব পুষ্টি উপাদান—
- রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখে।
- লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
পুষ্টিবিদদের মতে, অতীতে অনেক বাণিজ্যিক ব্রয়লার খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে নিয়ন্ত্রিত খামারগুলোতে এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি রয়েছে। তাই নিরাপদ ও অনুমোদিত খামারের ব্রয়লার মুরগি সাধারণত স্বাস্থ্যঝুঁকিমুক্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, দেশি মুরগি সাধারণত প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হওয়ায় অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকে।
স্বাস্থ্যকরভাবে মুরগির মাংস খাওয়ার উপায়
পুষ্টিবিদরা মুরগির মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—
- মুরগির চামড়া বাদ দিয়ে খাওয়া ভালো।
- অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে রান্না করুন।
- সবজি ও পূর্ণ শস্যের সঙ্গে মুরগির মাংস খাওয়ার অভ্যাস করুন।
- সপ্তাহে ২–৩ দিন প্রোটিনের উৎস হিসেবে রাখতে পারেন।
- সব সময় নিরাপদ ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে মুরগি কিনুন।
কোনটি বেছে নেবেন?
স্বাস্থ্য, বাজেট এবং সহজলভ্যতার বিষয় বিবেচনা করলে দেশি ও ব্রয়লার—দুটিই ভালো প্রোটিনের উৎস। তবে কম চর্বি, তুলনামূলক বেশি লোহা, ভিটামিন বি-১২ এবং ওমেগা-৩ থাকার কারণে দেশি মুরগি পুষ্টিগতভাবে কিছুটা এগিয়ে। তবুও নিরাপদ উৎসের ব্রয়লার মুরগিও সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তাই যেকোনো ধরনের মুরগির মাংস সঠিকভাবে রান্না করে, চামড়া বাদ দিয়ে এবং পরিমিত পরিমাণে খেলে তা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হবে।



























