সন্দেহজনক লেনদেন দেশে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নজরদারি জোরদারের ফলে গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা ৭৪ শতাংশ বেশি, যা দেশের আর্থিক খাতে নজরদারি ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে প্রকাশিত বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মোট প্রতিবেদনের মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (STR) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন (SAR)। এসব প্রতিবেদনের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে দেশের ব্যাংক খাত থেকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যাংকগুলোর রিপোর্টিং সংস্কৃতি আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ায় এই সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনভাবে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য জমা দিচ্ছে। আগে অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণে এমন তথ্য দিতে দ্বিধা করত। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। ফলে অর্থ পাচার, অবৈধ আর্থিক লেনদেন কিংবা অস্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শনাক্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হয় না। যে-ই আইনবিরোধী আর্থিক কার্যক্রমে জড়িত থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই নীতিই অনুসরণ করছে বিএফআইইউ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের মোট প্রতিবেদন ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত নয়; বরং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি শক্তিশালী হওয়ারও প্রতিফলন।
বিএফআইইউ জানিয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ অনুযায়ী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য রিপোর্টিং সংস্থার জন্য সন্দেহজনক লেনদেন বা কার্যক্রম শনাক্ত হলে তা দ্রুত বিএফআইইউকে জানানো বাধ্যতামূলক। কোনো অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেন, বড় অঙ্কের নগদ জমা, অস্বাভাবিক বিদেশি লেনদেন কিংবা সন্দেহজনক হিসাব পরিচালনার ঘটনা নজরে এলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদন পাঠাতে হয়।
এবারের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে অনলাইন জুয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সি, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং ডিজিটাল হুন্ডি সংক্রান্ত কার্যক্রমের বিষয়টি। বিএফআইইউর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর এসব আর্থিক কার্যক্রম দ্রুত বাড়ছে এবং এগুলোর মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এসব খাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট বৃদ্ধি পাওয়া একদিকে যেমন আর্থিক অপরাধ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ার প্রমাণ, অন্যদিকে এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার একটি ইতিবাচক দিকও নির্দেশ করে। তবে শুধু রিপোর্ট গ্রহণ নয়, দ্রুত তদন্ত, আইনগত ব্যবস্থা এবং অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা গেলে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে। দেশের আর্থিক খাতকে নিরাপদ রাখতে বিএফআইইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত তৎপরতা ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





























