রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ার নিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রকৌশল খাতের এই জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিটির শেয়ারদর মাত্র এক মাসে ৪২৯ টাকা ৪০ পয়সা বেড়েছে, যদিও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার সঙ্গে এ উত্থানের কোনো দৃশ্যমান মিল পাওয়া যাচ্ছে না। শেয়ারটির মূল্য-আয় অনুপাত (P/E Ratio) প্রায় ৯৮০-এ পৌঁছানোয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেড়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, ১৮ জুন রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারপ্রতি সমাপনী মূল্য ছিল ৫৫০ টাকা ২০ পয়সা। এক মাসের ব্যবধানে ১৭ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭৯ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে শেয়ারটির দাম বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। শুধু গত এক সপ্তাহেই শেয়ারটির দর বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।
শেয়ারদরের এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির ফলে কোম্পানিটির বাজার মূলধনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক মাস আগে যেখানে বাজার মূলধন ছিল প্রায় ১১০ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ১৯৬ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু এই সময়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে এমন কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (Price Sensitive Information-PSI) প্রকাশ করা হয়নি, যা এই মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
ডিএসই ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ জানতে কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। জবাবে রেণউইক যজ্ঞেশ্বর জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যা শেয়ারের এই উল্লম্ফনের কারণ হতে পারে। এরপরও দরবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত বুধবার লেনদেন চলাকালে একদিনের জন্য কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করে ডিএসই।
বাজারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শেয়ারদর বৃদ্ধির পেছনে কোনো গোপন তথ্য, সমন্বিত লেনদেন বা বাজার কারসাজির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে কোম্পানির কাছ থেকে অতিরিক্ত নথি ও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কোম্পানিটির পিই রেশিও প্রায় ৯৮০-এ পৌঁছানো। সাধারণভাবে পুঁজিবাজারে ১৫-এর নিচে পিই রেশিওকে তুলনামূলক নিরাপদ ধরা হয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ পিই রেশিও পর্যন্ত শেয়ারকে গ্রহণযোগ্য মনে করে। সেই হিসাবে রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের বর্তমান মূল্যায়ন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনও খুব একটা ইতিবাচক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (EPS) হয়েছে ১ টাকা ৭২ পয়সা। আর জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে মোট শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ১৪ পয়সা। একই সময়ে নগদ প্রবাহ ছিল নেগেটিভ ৫ টাকা ৯ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য (NAV) ছিল নেগেটিভ ১১২ টাকা ৭৩ পয়সা।
এর আগের অর্থবছরেও কোম্পানিটি লোকসানে থাকায় কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ধারাবাহিক লোকসান, নেতিবাচক নগদ প্রবাহ এবং নেগেটিভ সম্পদমূল্য থাকা সত্ত্বেও শেয়ারদরের লাগামহীন উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া রেণউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি বর্তমানে জেড ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির ৫১ শতাংশ শেয়ার সরকারের হাতে রয়েছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে পরিচালকরা প্রায় ১৪.৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ৩৪.৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের পরামর্শ, শুধুমাত্র শেয়ারদর বাড়ছে দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, পিই রেশিও, আয়, সম্পদমূল্য এবং ব্যবসার বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।





























