ভারতের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কুদানকুলামের তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স দাবি করেছে, রিলায়েন্স গ্রুপের একটি সার্ভার থেকে ফাঁস হওয়া বিপুল সংখ্যক নথির মধ্যে কুদানকুলাম পারমাণবিক কেন্দ্র-সংক্রান্ত প্রায় ১৯ হাজার নথিও রয়েছে। তবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআইএল) বলেছে, এসব তথ্যের সঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা বা চুল্লির গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ নামে একটি র্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী ডার্ক ওয়েবে ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপের প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার নথি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব নথির একটি অংশ কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো ও প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফাঁস হওয়া নথিগুলোর মধ্যে কেন্দ্রটির কিছু অবকাঠামোর নকশা, সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং বিমা-সংক্রান্ত নথিও রয়েছে। তবে রয়টার্স নিজেও জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে এসব নথির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। ফলে তথ্য ফাঁসের পরিমাণ ও প্রকৃতি নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।
রিলায়েন্স গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তাদের সার্ভার থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছে। ইয়োটা নামে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, মে মাসে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সার্ভারে সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সম্ভাব্য র্যানসমওয়্যার আক্রমণ প্রতিহত করা হয়। পরে তদন্তের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ২০১৮ সালে কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৃতীয় ও চতুর্থ ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব পায়। এই দুই ইউনিট এখনো নির্মাণাধীন এবং ২০২৭ সালে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাঁস হওয়া তথ্যগুলো সরাসরি পারমাণবিক চুল্লির মূল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কারণ মূল রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম সরবরাহ করেছে। তবুও অবকাঠামো-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে এনপিসিআইএল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যে নথিগুলো ফাঁস হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো শুধুমাত্র ‘ব্যালেন্স অব প্ল্যান্ট’ বা সাধারণ সেবা-সংক্রান্ত প্রকৌশল তথ্য। এসব তথ্যের সঙ্গে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচালনা প্রযুক্তি বা সংবেদনশীল নিরাপত্তা অবকাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলেও সংস্থাটি দাবি করেছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে দেওয়া চুক্তিটি ছিল প্রকৌশল, সরঞ্জাম সংগ্রহ, সরবরাহ এবং সাধারণ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য। এই প্রকল্পে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের মূল প্রযুক্তি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো দায়িত্ব তাদের ছিল না। ফলে ফাঁস হওয়া তথ্যে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে তাদের বক্তব্য।
তবে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ’ এই ঘটনার পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির মতে, ডার্ক ওয়েবে এমন তথ্য প্রকাশিত হলে ভবিষ্যতে তা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না দেওয়ায় জনমনে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার হামলা ও তথ্য ফাঁসের ঘটনা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুরক্ষায় এখন আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যদিও ভারত সরকার এবং এনপিসিআইএল আশ্বস্ত করেছে যে কুদানকুলাম পারমাণবিক কেন্দ্রের মূল নিরাপত্তা ব্যবস্থা অক্ষত রয়েছে, তবুও তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে।


























