ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি কমাতে এখন পরিবেশবান্ধব সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত অনেক রাসায়নিক সানস্ক্রিনের উপাদান সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে প্রবাল প্রাচীরের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। তাই সানস্ক্রিন কেনার আগে শুধু এসপিএফ নয়, এর উপাদান ও পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।
ফার্মেসির তাকজুড়ে বিভিন্ন ধরনের সানস্ক্রিন দেখা যায়। কোথাও এসপিএফ ১৫, কোথাও ৩০ বা ৫০+, আবার কোথাও লেখা থাকে ‘ব্রড স্পেকট্রাম’, ‘ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট’ কিংবা ‘রিফ-সেফ’। অনেকেই শুধু এসপিএফের সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর সুরক্ষার জন্য পণ্যের উপাদান, ত্বকের ধরন এবং পরিবেশগত প্রভাব—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
সানস্ক্রিনে যেসব উপাদান এড়িয়ে চলা ভালো
প্রাকৃতিক বা অরগানিক লেখা থাকলেই কোনো সানস্ক্রিন পরিবেশবান্ধব বা ভেগান হয় না। কিছু উপাদান প্রাণিজ উৎস থেকেও আসতে পারে।
যেসব উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকবেন—
- বিউক্সওয়াক্স (Beeswax): বাণিজ্যিক মৌমাছি পালনের কারণে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
- মধু: আর্দ্রতা ধরে রাখতে ব্যবহৃত হলেও সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
- স্টিয়ারিক অ্যাসিড: এটি প্রাণিজ কিংবা উদ্ভিজ্জ—দুই উৎস থেকেই আসতে পারে। তাই ‘Certified Vegan’ লেবেল থাকলে সেটি বেশি নির্ভরযোগ্য।
উদ্ভিজ্জ ক্যান্ডেলিলা ওয়াক্স, কোকো বাটার, শিয়া বাটার, জোজোবা তেল বা নারকেল তেলযুক্ত পণ্য তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে।
কোন ত্বকের জন্য কত এসপিএফ প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য একই এসপিএফ প্রয়োজন হয় না। ত্বকের ধরন অনুযায়ী সঠিক সানস্ক্রিন বেছে নেওয়া উচিত।
- ফোটো টাইপ ১ ও ২ (খুব ফর্সা ত্বক): এসপিএফ ৫০+ ব্যবহার উপযুক্ত।
- ফোটো টাইপ ৩ ও ৪ (মাঝারি বা অলিভ স্কিন): এসপিএফ ২০–৩০ যথেষ্ট।
- ফোটো টাইপ ৫ ও ৬ (গাঢ় ত্বক): সাধারণ অবস্থায় এসপিএফ ৬–১৫ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে বেশি এসপিএফ ব্যবহার করাই নিরাপদ।
কেন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক পরিবেশ?
বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার টন সানস্ক্রিন সমুদ্রে গিয়ে মিশে। এসব রাসায়নিকের মধ্যে থাকা অক্সিবেনজোন ও অক্টিনোক্সেট প্রবাল প্রাচীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এর ফলে—
- প্রবালের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- প্রজনন ব্যাহত হয়।
- কোরাল ব্লিচিং বা প্রবাল সাদা হয়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
পরিবেশবান্ধব সানস্ক্রিন চেনার ৯টি উপায়
সানস্ক্রিন কেনার সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন—
- জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইডযুক্ত খনিজ (Mineral) সানস্ক্রিন বেছে নিন।
- সম্ভব হলে নন-ন্যানো ফর্মুলা নির্বাচন করুন।
- বায়োডিগ্রেডেবল উপাদানযুক্ত পণ্য অগ্রাধিকার দিন।
- স্প্রে বা অ্যারোসল সানস্ক্রিন এড়িয়ে চলুন।
- মাইক্রোপ্লাস্টিক ও সিলিকনমুক্ত পণ্য বেছে নিন।
- অবশ্যই ব্রড-স্পেকট্রাম (UVA ও UVB) সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।
- উপাদানের তালিকা যত সহজ ও স্বচ্ছ হবে, তত ভালো।
- পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিফিলযোগ্য প্যাকেজিংকে গুরুত্ব দিন।
- স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত রিফ-সেফ সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
শুধু সানস্ক্রিনই যথেষ্ট নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সানস্ক্রিন ব্যবহারের পাশাপাশি কিছু অভ্যাসও জরুরি।
- সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে দীর্ঘ সময় রোদে থাকা এড়িয়ে চলুন।
- চওড়া কিনারার টুপি ও ইউভি-প্রতিরোধী সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
- হালকা রঙের সুতি পোশাক পরুন।
- প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর এবং সাঁতার কাটার পর আবার সানস্ক্রিন লাগান।
- এক বছরের বেশি পুরোনো সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন না।
গবেষণা কী বলছে?
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক মানুষ শুধু সানস্ক্রিন ব্যবহার করেই দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান করেন। ফলে পুনরায় সানস্ক্রিন লাগাতে ভুলে যান এবং শেষ পর্যন্ত ত্বক আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের মতে, সানস্ক্রিন একাই স্কিন ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে না। কার্যকর সুরক্ষার জন্য সানস্ক্রিনের পাশাপাশি ছায়ায় থাকা, সুরক্ষামূলক পোশাক পরা এবং দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ত্বকের সুরক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। তাই পরবর্তীবার সানস্ক্রিন কেনার সময় শুধু এসপিএফ নয়, এর উপাদান, নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় রাখুন। এতে আপনার ত্বক যেমন নিরাপদ থাকবে, তেমনি সুরক্ষিত থাকবে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও।




























