রাজশাহীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা একটি মামলায় মো. খয়বর হোসেন ওরফে সুকুমার (৪৫) নামের এক আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অনাদায়ে তাকে আরও অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে রাজশাহীর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-২ আদালতের বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত মো. খয়বর হোসেন ওরফে সুকুমার নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার মধুবন গ্রামের মৃত খলিলের ছেলে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি র্যাব-৫, রাজশাহী গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে খয়বর হোসেনের কাছ থেকে প্রায় ৬০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া হেরোইনের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ধারণা করা হয়েছিল।
অভিযান শেষে তাকে ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং উদ্ধার হওয়া হেরোইন জব্দ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঘটনার পর রাজশাহী মহানগরীর বেলপুকুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) ৮(গ) ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
তদন্ত শেষে বেলপুকুর থানা পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযোগের সত্যতা পান। পরে তিনি আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের সাক্ষ্য, জব্দ তালিকা, রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত আদালতে উপস্থাপন করে। সব তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন।
ফলে আদালত খয়বর হোসেনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর আওতায় হেরোইন, ইয়াবা, আইস ও অন্যান্য মাদক সংশ্লিষ্ট মামলায় আদালত কঠোর সাজা প্রদান করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাদক পাচার, সংরক্ষণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবসা দমনে কঠোর বিচারিক ব্যবস্থা অপরাধ প্রবণতা কমাতে সহায়ক হলেও এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী হেরোইনের মতো কঠিন মাদক উৎপাদন, বহন, সংরক্ষণ, বিক্রি বা পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের ধরন ও উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ বিবেচনায় কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনটির উদ্দেশ্য দেশে মাদক পাচার ও অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যৌথভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও আন্তঃজেলা মহাসড়কে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে মাদক পাচারের রুটগুলো শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবসা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই বিচারিক কঠোরতার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, তরুণদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, মাদকের চাহিদা কমাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের এ ধরনের রায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে তারা মনে করেন।




























