বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের হয়ে মাঠে নামার আগে মার্ক কুকুরেয়ার চোখ শুধু ট্রফির দিকে নয়, গ্যালারির দিকেও থাকবে। কারণ এবার প্রথমবারের মতো বড় মঞ্চে বাবার খেলা দেখতে আসছে তাঁর অটিজমে আক্রান্ত ছেলে মাতেও। ফুটবল মাঠের বাইরে ছেলেকে নিয়ে গত ছয় বছরের যে সংগ্রাম, সেটিই আজ কুকুরেয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় গল্প।
বাবার সবচেয়ে বড় সমর্থক এবার গ্যালারিতে
বিশ্বকাপের পুরো আসরে মাতেওকে খুব বেশি স্টেডিয়ামে আনেননি কুকুরেয়া। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ায় অতিরিক্ত শব্দ, ভিড় ও উজ্জ্বল আলো তার জন্য অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
এর আগে কুকুরেয়া জানিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে শুধু ফাইনাল ম্যাচেই ছেলেকে স্টেডিয়ামে আনবেন। সেই ইচ্ছাই এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। বাবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা এবার গ্যালারি থেকেই দেখবে ছোট্ট মাতেও।
যেদিন বুঝলেন ছেলে অন্যদের চেয়ে আলাদা
কুকুরেয়া ও তাঁর সঙ্গী ক্লদিয়া রদ্রিগেজের তিন সন্তান। বড় ছেলে মাতেও ছোটবেলা থেকেই অন্য শিশুদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন আচরণ করত।
সে দেরিতে কথা বলা শুরু করে, নতুন পরিবেশে সহজে মানিয়ে নিতে পারত না এবং মানুষের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যোগাযোগও করত না। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, মাতেও অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে কুকুরেয়া বলেন, সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল কীভাবে ছেলেকে সাহায্য করবেন, সেটাই বুঝতে না পারা।
বাবা হওয়ার সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা
ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একাধিকবার আবেগাপ্লুত হয়েছেন এই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার।
তাঁর ভাষায়, বাবা-মা হওয়ার কোনো প্রশিক্ষণ নেই। অটিজমে আক্রান্ত একটি শিশুকে বুঝতে হলে পরিবারকেই নতুন করে শিখতে হয়, কীভাবে তার অনুভূতি ও চাহিদা বোঝা যায়।
শুরুর দিকে সাধারণ স্কুলে ভর্তি হলেও মাতেও সেখানে মানিয়ে নিতে পারেনি। পরে বিশেষায়িত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষক ও থেরাপিস্টদের সহায়তায় ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
পরিবারের স্বস্তি ফিরতেই বদলে যায় কুকুরেয়ার ক্যারিয়ার
চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর কুকুরেয়ার শুরুটা ছিল কঠিন। মাঠে সমালোচনা, বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফির চাপ—সবকিছুর পাশাপাশি পরিবারও লড়ছিল মাতেওর চিকিৎসা নিয়ে।
সময়ের সঙ্গে ছেলের জন্য উপযুক্ত থেরাপি ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তা পাওয়ার পর পরিবারে স্বস্তি ফিরে আসে। সেই পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কুকুরেয়ার পারফরম্যান্সেও। ধীরে ধীরে তিনি আবার নিজের সেরা ছন্দ ফিরে পান এবং এখন স্পেনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার।
ফুটবলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এখন পরিবার
ছেলের অভিজ্ঞতা কুকুরেয়ার জীবনের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে।
এখন নতুন কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি শুধু বেতন বা ফুটবল নয়, বরং সেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য উন্নত চিকিৎসা, বিশেষায়িত স্কুল ও থেরাপির সুযোগ আছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।
ফুটবলারদের জীবনও নিখুঁত নয়
প্রাইম ভিডিওর তথ্যচিত্র Married to the Game-এ নিজের পরিবারের গল্প বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন কুকুরেয়া।
তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন ফুটবলারদের জীবন নিখুঁত। কিন্তু বাস্তবে তাদেরও সাধারণ মানুষের মতো দুশ্চিন্তা, সংগ্রাম এবং পারিবারিক লড়াই রয়েছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, অটিজম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা আরও অনেক পরিবারকে সচেতন হতে সাহায্য করবে এবং প্রাথমিক লক্ষণ বুঝে দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে উৎসাহ দেবে।
ট্রফির চেয়েও বড় অর্জন
বিশ্বকাপের ফাইনালে কুকুরেয়া জিততে পারেন, হারতেও পারেন। কিন্তু তাঁর নিজের কাছে সবচেয়ে বড় জয় কোনো ট্রফি নয়।
ছেলে মাতেওর প্রতিটি ছোট ছোট অগ্রগতিকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে করেন। কুকুরেয়ার ভাষায়, “সবকিছুই কঠিন, কিন্তু ও যখন সামান্য এগিয়ে যায়, সেই আনন্দের সঙ্গে পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা হয় না।”


























