১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামো থেকেই শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল সেই রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (সিবিএস) আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা: বিচার, সংস্কার ও পুনর্গঠন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের কাঠামো ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করেছে এবং সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তিনি দাবি করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের আত্মত্যাগ ছিল এই কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য।
জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এটি কোনো বহিরাগত শক্তির কাজ ছিল না; রাষ্ট্র নিজেই এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করেছে। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় একে ‘স্টেট-স্পন্সরড টেররিজম’ বলা হয়। অতীতে আর্জেন্টিনা ও চিলির সামরিক শাসনামলেও একই ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রানজিশনাল জাস্টিস নিশ্চিত না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয় বলেও মন্তব্য করেন ড. দিলারা চৌধুরী। তার ভাষ্য, মানুষ ন্যায়বিচার না পেলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা মব ভায়োলেন্সকে উৎসাহিত করে। তাই মব ভায়োলেন্স রোধে আগে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই সনদে ক্ষমতার ভারসাম্যসংক্রান্ত যে সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, তার বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং গণভোটকে অসাংবিধানিক বলা হচ্ছে, যা হতাশাজনক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের অধিকাংশ মানুষ কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। সেই বাস্তবতা থেকেই জুলাই বিপ্লবের জন্ম হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে তাড়াহুড়ার পরিবর্তে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, ট্রুথ কমিশনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, জুলাই একটি ঐতিহাসিক বিপ্লব এবং এ বিপ্লবকে ব্যর্থ হতে দেওয়া হবে না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাযজ্ঞের বিচার দাবি করায় দীর্ঘদিন মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তদন্তে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে এবং বিডিআর সদস্যদের উসকানি দেওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। এছাড়া বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংবিধানের ত্রুটি সংশোধনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, কমিশনের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হতে পারে।



























