রাষ্ট্র সংস্কার ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রত্যাশাগুলোর একটি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে একের পর এক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার নিয়ে কমিশনগুলো দীর্ঘ সময় কাজ করে। পরে এসব সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির সময় এসে দেখা যাচ্ছে, মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়নের বাইরে।
সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির জন্য গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে। এর ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়, যার মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধান-সম্পর্কিত। উচ্চকক্ষ গঠন, সংসদে প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসহ বেশ কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসার কথা ছিল। এরপর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করে আদেশ জারি এবং জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজন করা হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।
মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে। বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে আলাদা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিএনপির অবস্থান হলো, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওই প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। দলটি অবশ্য সনদে যেসব বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে। এর পরিবর্তে এখন জাতীয় সংসদে নতুন করে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সংবিধানের বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি মিশ্র। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। এর মধ্যে ১১০টি বর্তমান সংসদ অনুমোদন করেছে। ফলে বেশ কিছু অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়েছে। তবে বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের জন্য পৃথক সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং পুলিশ কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার উদ্যোগ এখনো পূর্ণাঙ্গ আইনি ভিত্তি পায়নি। এসব বিষয়ে নতুন করে বিল আনার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। ফলে রাষ্ট্র সংস্কার-এর ক্ষেত্রে আইন পরিবর্তনের কিছু কাজ হলেও কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না।
তবে পুরো প্রক্রিয়াকে স্থবির বলাও ঠিক হবে না। বর্তমান সংসদ বাংলাদেশ ব্যাংক, জ্বালানি, সরকারি চাকরি, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জারি করা একাধিক অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে কিছু আইনি পরিবর্তনও কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ নতুন কিছু আইন প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তাবিত কিছু প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার কাঠামো বর্তমান প্রক্রিয়ায় কতটা বজায় থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি জুলাই জাতীয় সনদ রয়েছে, অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারের নিজস্ব নির্বাচনী অঙ্গীকার ও সংস্কার-ভাবনা রয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে কতটা রূপ পাবে—তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের সংসদীয় কার্যক্রম ও রাজনৈতিক সমঝোতায়।



























