দেশের বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার ও সম্পাদক আখতার হুসেন আর নেই। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন আখতার হুসেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। সর্বশেষ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও রক্তচাপ কমে যাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন তিনি। সহজ, প্রাণবন্ত ও ছন্দময় ভাষায় লেখা তাঁর ছড়াগুলো শিশুদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিধি শুধু ছড়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। শিশুতোষ মৌলিক বই, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তাঁর।
আখতার হুসেনের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর লেখনী সক্রিয় ছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিতি পায়। স্বাধীনতার চেতনা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত এই সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।
পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আখতার হুসেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ ও প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল। শিশু ও তরুণদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন।
সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার এবং বজলুর রহমান স্মৃতিপদক উল্লেখযোগ্য। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন।
আখতার হুসেনের মৃত্যুতে বাংলা শিশুসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো। তাঁর লেখা ছড়া, শিশুতোষ গ্রন্থ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সৃষ্টিগুলো পাঠকের কাছে দীর্ঘদিন তাঁর স্মৃতি ধরে রাখবে।


























