ঢাকা ১১:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo জুলাইয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রংপুর রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ পঞ্চগড় জেলা পুলিশ Logo রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হলে মন্ত্রিত্ব ও মহাসচিবের পদ ছাড়তে পারেন মির্জা ফখরুল Logo ওমানের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের দূতাবাসের জরুরি সতর্কবার্তা Logo মেট্রোরেলে ভাড়া ফাঁকি দিতে গেটের নিচ দিয়ে ঢুকলেন কয়েক নারী Logo রাতে মেট্রোরেলের সময় বাড়ছে, সেপ্টেম্বরে চলবে ১১টা পর্যন্ত Logo জীবন বদলে গেলেও প্রথম প্রেম কেন থেকে যায় হৃদয়ের কোণে! Logo প্রতিদিন রোদ পোহান কিন্তু জানেন কি শরীরের জন্য ঠিক কতটা রোদ প্রয়োজন Logo ওজন কমাতে কঠিন ডায়েট নয় প্রতিদিনের খাবারে আনুন এই ছয়টি বদল Logo তীব্র গরমে বাড়ছে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ নিজেকে শান্ত রাখতে যা করবেন Logo আমেরিকায় পুলিশ গাড়ি থামালে ৪ কথা এড়িয়ে চলুন

আজকের চট্টগ্রামের শুরুটা হয়েছিল যেভাবে ব্রিটিশ আমলে

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৯:১২:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫২৫

রেল ও বন্দরকে ঘিরে বদলে যাওয়া পুরোনো চট্টগ্রাম। গ্রাফিক্সঃ মীরর বাংলা

ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রাম ছিল এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন একটি বন্দরনগরী ধীরে ধীরে আধুনিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল। কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের বন্দর আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে উনিশ শতকের শেষ দিকে রেল যোগাযোগের বিস্তার শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। চট্টগ্রামের পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল রেলপথের। ব্রিটিশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের কাছে চট্টগ্রামকে আসাম ও পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আসামের চা এবং পূর্ববঙ্গের পাটসহ বিভিন্ন পণ্য সহজে বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন থেকেই আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পরিকল্পনা এগোয়।

১৮৯১ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের নির্মাণকাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার মিটারগেজ রেললাইন চালু হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগও তৈরি হয়। ফলে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। রেলপথ চালুর ফলে চট্টগ্রামের সঙ্গে শুধু আশপাশের অঞ্চল নয়, বৃহত্তর পূর্ববঙ্গ ও আসামের বাণিজ্যিক যোগাযোগও শক্তিশালী হতে থাকে। রেললাইন দিয়ে চা, পাটসহ বিভিন্ন পণ্য বন্দরে আনা সহজ হয়। অন্যদিকে বন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য সমুদ্রপথে বিদেশের বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ রেল ও বন্দর একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

তবে শুধু রেললাইন তৈরি হলেই বন্দরের আধুনিকায়ন সম্পূর্ণ হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য প্রয়োজন ছিল স্থায়ী জেটি, গুদাম ও অন্যান্য সুবিধার। ১৮৮৭ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং ১৮৮৮ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বন্দর ও রেলওয়ের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে জেটি নির্মাণের কাজও এগিয়ে যায়। ১৮৯৯ সালে ডাবল মুরিং এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জেটি চালু হয়। পরে আরও জেটি নির্মাণ করা হয়। ১৮৯৯ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের উদ্যোগে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়। এসব উন্নয়ন বন্দরের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯০৩ সালে বন্দরের জেটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের হাতে যাওয়াও ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এতে রেল ও বন্দরের কার্যক্রম আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে জটিলতাও তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে বন্দর পরিচালনার কাঠামো নিয়ে আরও পরিবর্তন আসে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ চট্টগ্রামের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নতুন গঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে চট্টগ্রাম ছিল প্রধান সমুদ্রবন্দর। প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি যোগাযোগ ও বাণিজ্য খাতেও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশি বাণিজ্য বাড়তে থাকে এবং শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

রেল ও বন্দরের এই পরিবর্তনের প্রভাব শহরের ভেতরেও পড়েছিল। রেলওয়ের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে স্টেশন, কর্মচারীদের আবাসন, অফিস, হাসপাতাল ও কর্মশালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠে। পাহাড়তলী এলাকায় রেলওয়ের অবকাঠামোও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। আজকের চট্টগ্রামের কিছু পুরোনো রেল স্থাপনা সেই সময়ের নগর পরিবর্তনের স্মৃতি বহন করছে। চট্টগ্রাম তখন শুধু পণ্য ওঠানামার জায়গা ছিল না। রেল ও বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের চলাচল বাড়তে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ কাজ ও ব্যবসার প্রয়োজনে চট্টগ্রামে আসতে শুরু করেন। এর ফলে শহরের জনজীবন ও নগর কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে।

এই সময়ের পরিবর্তনকে বুঝতে হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়েকে আলাদা করে দেখা কঠিন। রেলপথ পণ্যকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করেছিল, আর বন্দর সেই পণ্যকে সমুদ্রপথে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। এই দুই অবকাঠামোর সমন্বয় চট্টগ্রামকে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে সহায়তা করে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঐতিহাসিক তথ্যেও দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে বন্দরের অবকাঠামো ধাপে ধাপে উন্নত হয়েছে। ১৯১০ সালের মধ্যে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণের তথ্য রয়েছে এবং একই সময় রেল যোগাযোগও বন্দরের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হয়।

পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের গুরুত্ব আরও বাড়ে। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘মেজর পোর্ট’ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্যিক মানচিত্রে চট্টগ্রামের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আজকের ব্যস্ত চট্টগ্রামকে দেখলে হয়তো কল্পনা করা কঠিন, একসময় এই শহরের বন্দর ও রেলপথ ছিল অনেক ছোট পরিসরের। কিন্তু সেই সময়ের পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগই পরবর্তী চট্টগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে।

তবে ব্রিটিশ আমলের উন্নয়নকে শুধু শহরের আধুনিকায়নের গল্প হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এসব অবকাঠামোর পেছনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অর্থনীতির প্রয়োজনও ছিল। আসামের চা ও পূর্ববঙ্গের পাটসহ বিভিন্ন পণ্য দ্রুত বন্দরে এনে বিদেশি বাজারে পাঠানো ছিল রেল ও বন্দর উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। তবুও ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই সময়টি চট্টগ্রামের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের অধ্যায়। রেললাইন, জেটি, গুদাম ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য শহরটির চেহারা বদলে দেয়। কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা পুরোনো বন্দরনগরী ধীরে ধীরে একটি আধুনিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যকেন্দ্রের রূপ নিতে শুরু করে।

আজ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই বর্তমানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ছিল ব্রিটিশ আমলে রেল ও বন্দরের বিস্তার, যা চট্টগ্রামের নগরজীবন ও অর্থনীতিকে নতুন পথে এগিয়ে দিয়েছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাইয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রংপুর রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ পঞ্চগড় জেলা পুলিশ

আজকের চট্টগ্রামের শুরুটা হয়েছিল যেভাবে ব্রিটিশ আমলে

Update Time : ০৯:১২:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রাম ছিল এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন একটি বন্দরনগরী ধীরে ধীরে আধুনিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল। কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের বন্দর আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে উনিশ শতকের শেষ দিকে রেল যোগাযোগের বিস্তার শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। চট্টগ্রামের পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল রেলপথের। ব্রিটিশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের কাছে চট্টগ্রামকে আসাম ও পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আসামের চা এবং পূর্ববঙ্গের পাটসহ বিভিন্ন পণ্য সহজে বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন থেকেই আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পরিকল্পনা এগোয়।

১৮৯১ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের নির্মাণকাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার মিটারগেজ রেললাইন চালু হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগও তৈরি হয়। ফলে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। রেলপথ চালুর ফলে চট্টগ্রামের সঙ্গে শুধু আশপাশের অঞ্চল নয়, বৃহত্তর পূর্ববঙ্গ ও আসামের বাণিজ্যিক যোগাযোগও শক্তিশালী হতে থাকে। রেললাইন দিয়ে চা, পাটসহ বিভিন্ন পণ্য বন্দরে আনা সহজ হয়। অন্যদিকে বন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য সমুদ্রপথে বিদেশের বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ রেল ও বন্দর একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন  ব্যাংক আমানত: ৫৬ শতাংশ টাকা ব্যক্তির হিসাবেই জমা

তবে শুধু রেললাইন তৈরি হলেই বন্দরের আধুনিকায়ন সম্পূর্ণ হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য প্রয়োজন ছিল স্থায়ী জেটি, গুদাম ও অন্যান্য সুবিধার। ১৮৮৭ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং ১৮৮৮ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বন্দর ও রেলওয়ের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে জেটি নির্মাণের কাজও এগিয়ে যায়। ১৮৯৯ সালে ডাবল মুরিং এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জেটি চালু হয়। পরে আরও জেটি নির্মাণ করা হয়। ১৮৯৯ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের উদ্যোগে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়। এসব উন্নয়ন বন্দরের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯০৩ সালে বন্দরের জেটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের হাতে যাওয়াও ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এতে রেল ও বন্দরের কার্যক্রম আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে জটিলতাও তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে বন্দর পরিচালনার কাঠামো নিয়ে আরও পরিবর্তন আসে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ চট্টগ্রামের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। নতুন গঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে চট্টগ্রাম ছিল প্রধান সমুদ্রবন্দর। প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি যোগাযোগ ও বাণিজ্য খাতেও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশি বাণিজ্য বাড়তে থাকে এবং শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা সমস্যা বাড়ছে: ১০ হাজার কোটি টাকায়ও মিলছে না সমাধান

রেল ও বন্দরের এই পরিবর্তনের প্রভাব শহরের ভেতরেও পড়েছিল। রেলওয়ের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে স্টেশন, কর্মচারীদের আবাসন, অফিস, হাসপাতাল ও কর্মশালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠে। পাহাড়তলী এলাকায় রেলওয়ের অবকাঠামোও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। আজকের চট্টগ্রামের কিছু পুরোনো রেল স্থাপনা সেই সময়ের নগর পরিবর্তনের স্মৃতি বহন করছে। চট্টগ্রাম তখন শুধু পণ্য ওঠানামার জায়গা ছিল না। রেল ও বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের চলাচল বাড়তে থাকে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ কাজ ও ব্যবসার প্রয়োজনে চট্টগ্রামে আসতে শুরু করেন। এর ফলে শহরের জনজীবন ও নগর কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে।

এই সময়ের পরিবর্তনকে বুঝতে হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়েকে আলাদা করে দেখা কঠিন। রেলপথ পণ্যকে বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করেছিল, আর বন্দর সেই পণ্যকে সমুদ্রপথে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। এই দুই অবকাঠামোর সমন্বয় চট্টগ্রামকে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে সহায়তা করে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঐতিহাসিক তথ্যেও দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে বন্দরের অবকাঠামো ধাপে ধাপে উন্নত হয়েছে। ১৯১০ সালের মধ্যে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণের তথ্য রয়েছে এবং একই সময় রেল যোগাযোগও বন্দরের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হয়।

পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের গুরুত্ব আরও বাড়ে। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘মেজর পোর্ট’ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্যিক মানচিত্রে চট্টগ্রামের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আজকের ব্যস্ত চট্টগ্রামকে দেখলে হয়তো কল্পনা করা কঠিন, একসময় এই শহরের বন্দর ও রেলপথ ছিল অনেক ছোট পরিসরের। কিন্তু সেই সময়ের পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগই পরবর্তী চট্টগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে।

আরও পড়ুন  ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, কী চ্যালেঞ্জ সামনে?

তবে ব্রিটিশ আমলের উন্নয়নকে শুধু শহরের আধুনিকায়নের গল্প হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এসব অবকাঠামোর পেছনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অর্থনীতির প্রয়োজনও ছিল। আসামের চা ও পূর্ববঙ্গের পাটসহ বিভিন্ন পণ্য দ্রুত বন্দরে এনে বিদেশি বাজারে পাঠানো ছিল রেল ও বন্দর উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। তবুও ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই সময়টি চট্টগ্রামের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের অধ্যায়। রেললাইন, জেটি, গুদাম ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য শহরটির চেহারা বদলে দেয়। কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা পুরোনো বন্দরনগরী ধীরে ধীরে একটি আধুনিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যকেন্দ্রের রূপ নিতে শুরু করে।

আজ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই বর্তমানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ছিল ব্রিটিশ আমলে রেল ও বন্দরের বিস্তার, যা চট্টগ্রামের নগরজীবন ও অর্থনীতিকে নতুন পথে এগিয়ে দিয়েছিল।