আফরোজার সংগ্রাম শুধু জীবিকা চালানোর গল্প নয়, এটি একজন মায়ের বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে অটোরিকশার চালকের আসনে বসে আছেন একজন নারী। এক হাতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ, অন্য হাতে সন্তানের নিরাপত্তা। তার কোলে ১০ মাসের ছোট্ট শিশু। দৃশ্যটি যেমন হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তেমনি সামনে আনে এক কঠিন বাস্তবতাও। প্রতিদিন ভোর হলেই অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হন আফরোজা। সঙ্গে থাকে তার ছোট্ট মেয়ে। শিশুটিকে দেখাশোনার মতো কেউ নেই। তাই সন্তানকে একা রেখে কাজের সন্ধানে বের হওয়ার সুযোগও নেই তার। বাধ্য হয়ে বুকের সঙ্গে শিশুকে জড়িয়ে নিয়েই রাস্তায় নামতে হয় তাকে।
দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালান আফরোজা। কখনো যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যস্ততা, কখনো শিশুর কান্না থামানোর চেষ্টা। কাজের মাঝেই মাকে সামলাতে হয় দুই দায়িত্ব। একদিকে পরিবারের খাবার ও জীবিকার চিন্তা, অন্যদিকে সন্তানের নিরাপত্তা। আফরোজার বর্তমান জীবন আরও কঠিন হয়েছে থাকার জায়গা হারানোর পর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মিরপুরের ফুটপাতে থাকেন তিনি। মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নেই। অনেক সময় দোকানের সামনে শিশুকে নিয়ে রাত কাটাতে হয়। সারাদিন কাজ করার পরও নিরাপদ একটি ঘরের নিশ্চয়তা নেই তার।
এই জীবনযাপন নিয়ে মানুষের কটূক্তিও শুনতে হয় তাকে। রাস্তায় থাকার কারণে অনেকেই নানা মন্তব্য করেন। কিন্তু এসব কথা এখন আর তাকে থামাতে পারে না। কারণ তার কাছে প্রতিদিনের কাজ মানেই সন্তানের জন্য খাবার জোগাড় করা এবং আগামী দিনটি পার করার চেষ্টা। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন আফরোজা। অভাবের কারণে পড়াশোনা আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। অথচ তার নিজের একটি বড় স্বপ্ন ছিল। লেখাপড়া করে একদিন পুলিশের চাকরি করবেন। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চাপে সেই স্বপ্ন অনেক আগেই থেমে যায়।
নিজের সেই অপূর্ণ স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে আফরোজা জানান, লেখাপড়া করার অনেক ইচ্ছা ছিল তার। পুলিশের চাকরি করারও স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে সেই সুযোগ দেয়নি।তবুও স্বপ্ন দেখা থামাননি এই মা। নিজের জন্য নয়, এবার মেয়ের জন্য স্বপ্ন দেখছেন তিনি। মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করতে চান। তার ইচ্ছা, সুযোগ পেলে মেয়েকে হাফেজি পড়াশোনা করাবেন। আফরোজার জীবনে সংকট শুরু হয়েছিল সংসারেও। একসময় পোশাক তৈরির দোকানে কাজ করতেন তিনি। পরে সেখান থেকেই এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর জানতে পারেন, ওই ব্যক্তির আগেই আরেকটি সংসার রয়েছে এবং সেখানে দুটি সন্তানও আছে।
বিয়ের পরও তার জীবনে স্বস্তি আসেনি। আফরোজার অভিযোগ, স্বামী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। সন্তান জন্মের সময় সিজারের খরচ মেটানোর জন্য কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই টাকাও স্বামী নিয়ে যান বলে দাবি আফরোজার।পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর। সংসার কিছুটা স্বাভাবিক করার আশায় স্বামীর জন্য একটি রিকশার ব্যবস্থা করেছিলেন আফরোজা। কিন্তু তার দাবি, সেই রিকশাটিও বিক্রি করে তিনি চলে যান।
এরপর নিজের জীবন চালানোর দায়িত্ব পুরোপুরি আফরোজার কাঁধে এসে পড়ে। এখন অন্যের অটোরিকশা চালান তিনি। প্রতিদিন গাড়ির মালিককে টাকা দিতে হয়। অর্থাৎ সারাদিন রাস্তায় পরিশ্রম করেও উপার্জনের একটি অংশ চলে যায় গাড়ির ভাড়ায়। তারপরও কাজ থামানোর সুযোগ নেই। কারণ কাজ বন্ধ হলে বন্ধ হয়ে যাবে আয়। আর আয় না থাকলে সন্তানকে খাওয়ানো কিংবা থাকার ব্যবস্থা করা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
আফরোজার কথায়, অনেক সময় রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে হয়। টাকার জন্য তাকে চাপের মুখেও কাজ করতে হয়। একজন নারী হিসেবে রাজধানীর রাস্তায় এত দীর্ঘ সময় কাজ করা যেমন কঠিন, তেমনি কোলে শিশুকে নিয়ে গাড়ি চালানো আরও বড় ঝুঁকি। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে। একজন মা যখন সন্তানকে কোলে নিয়েই কাজ করতে বাধ্য হন, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কতটা রয়েছে?
শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চলন্ত অটোরিকশায় শিশুকে কোলে নিয়ে গাড়ি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আফরোজার বাস্তবতা হলো, শিশুকে রেখে যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা বা নির্ভরযোগ্য দেখাশোনার ব্যবস্থা তার নেই। ফলে ঝুঁকি জেনেও তাকে এই পথ বেছে নিতে হচ্ছে। আফরোজার গল্প তাই শুধু দারিদ্র্যের গল্প নয়। এটি একজন নারীর দায়িত্ব, মাতৃত্ব, প্রতিকূলতা এবং স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে থাকার গল্প। সমাজের নানা বাধা, কটু কথা, অনিশ্চিত বাসস্থান এবং আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি প্রতিদিন রাস্তায় নামছেন।
তার অটোরিকশায় প্রতিদিন হয়তো অনেক যাত্রী ওঠেন। কেউ হয়তো গন্তব্যে পৌঁছে নেমে যান। কিন্তু গাড়ির চালকের আসনে বসে থাকা এই মায়ের জীবনের গল্প হয়তো তাদের অধিকাংশই জানেন না। যে হাতে অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ থাকে, সেই হাতেই সন্তানের যত্ন নিতে হয় আফরোজাকে। যে রাস্তায় তিনি জীবিকার জন্য ছুটে চলেন, সেই রাস্তাই আবার তার রাত কাটানোর জায়গাও হয়ে উঠেছে। তার জীবনে নিরাপদ ঘর নেই, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নেই, তবুও রয়েছে একটি স্বপ্ন।
সেই স্বপ্ন তার মেয়েকে ঘিরে। নিজের মতো করে মেয়ের জীবন যেন কষ্টে না কাটে, সেটিই তার সবচেয়ে বড় চাওয়া। যে শিক্ষা ও সুযোগ তিনি পাননি, মেয়ের জন্য সেটিই নিশ্চিত করতে চান।আফরোজার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজের অনেক মায়ের জীবন প্রতিদিন নীরবে চলে যায় আমাদের চোখের সামনে। তারা আলোচনায় আসেন না, বড় কোনো পরিচয়ও থাকে না। কিন্তু সন্তানকে ভালো রাখার জন্য তাদের লড়াই কখনো ছোট নয়।
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে শিশুকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে অটোরিকশা চালানো আফরোজার দৃশ্য তাই শুধু একজন মায়ের ছবি নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে একজন নারী নিজের ভাঙা স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়েই সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন। আজকের আফরোজা হয়তো ফুটপাতে রাত কাটান, অন্যের গাড়ি চালান এবং প্রতিদিন নানা কষ্টের মুখোমুখি হন। কিন্তু মেয়েকে ঘিরে তার যে স্বপ্ন, সেটিই তাকে প্রতিদিন আবার রাস্তায় নামার শক্তি দেয়। জীবনের কাছে বারবার হারলেও



























