শিশু গোপনীয়তা নিয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মেটা। যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন ফিচার শিশু ও কিশোরদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে এবং তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মামলায় বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবিও তোলা হয়েছে।
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ চায়নি, বরং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহার পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কিশোর ব্যবহারকারীদের বয়স বা অভিভাবক যাচাই, লাইক সংখ্যা বন্ধ করা, ভিডিওর স্বয়ংক্রিয় প্লে সীমিত করা এবং একাধিক অ্যাকাউন্ট তৈরির সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করা। ইনস্টাগ্রাম স্টোরির মতো অস্থায়ী পোস্ট নিয়েও পরিবর্তনের দাবি রয়েছে।
মামলাটি মেটার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এসব ফিচার বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অন্যতম প্রধান অংশ। ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখানো, নোটিফিকেশন পাঠানো এবং একের পর এক ভিডিও বা পোস্ট দেখানোর ব্যবস্থা মানুষকে প্ল্যাটফর্মে আরও বেশি সময় রাখতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এই কৌশলগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
শিশু গোপনীয়তা বিতর্কের পাশাপাশি লাইক সংখ্যা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক অনেক সময় জনপ্রিয়তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার একটি মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অন্যের পোস্টের সঙ্গে নিজের জনপ্রিয়তা তুলনা করার প্রবণতা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। মামলায় মেটার নিজস্ব গবেষণার কিছু তথ্যও আলোচনায় এসেছে, যেখানে সামাজিক তুলনা, একাকিত্ব ও নিজের চেহারা নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মতো বিষয় উঠে এসেছে।
এর আগে নিউ মেক্সিকোতেও মেটার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় এসেছে। সেখানে আদালত কোম্পানিটিকে বড় অঙ্কের জরিমানা করার পাশাপাশি কিশোরদের জন্য কিছু ফিচার পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য লাইক সংখ্যা সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ ছিল। মেটা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে আইনি লড়াই আরও বড় হচ্ছে।
শিশু গোপনীয়তা মামলায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য সফল হলে এর প্রভাব শুধু একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। এসব অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার বড় একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই আদালতের নির্দেশনা কার্যকর হলে মেটাকে দেশজুড়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন ফিচার পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এতে লাইক, রিকমেন্ডেশন, নোটিফিকেশন, ভিডিও প্লেব্যাক এবং কিশোরদের অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
এই মামলার ফল তাই শুধু মেটার জন্য নয়, পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আদালত যদি মনে করে প্ল্যাটফর্মের নকশা শিশুদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপরও একই ধরনের আইনি চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা ও নীতিও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মেটা শেষ পর্যন্ত মামলায় জয়ী হবে নাকি আদালতের নির্দেশে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বড় পরিবর্তন আনতে হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি ও সামাজিক চাপ দ্রুত বাড়ছে। এই মামলার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে মানুষ কীভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করবে, বিশেষ করে তরুণ ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা কেমন হবে, তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।



























