ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর পথে বড় অগ্রগতি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর কমিউটার করিডোরকে বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে দেশের মূল রেলপথে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যস্ত রুটে নতুন প্রযুক্তি চালু হলে একদিকে যেমন ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে, অন্যদিকে বাড়বে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতাও। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা EMU ট্রেন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে থাকবে পাঁচটি কোচ। ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুর এলাকায় আধুনিক ওয়ার্কশপ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে যাত্রীসেবায়। প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, এই করিডোরে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার যাত্রীর পরিবর্তে ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি যাত্রা পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক ট্রেন সার্ভিস ৬৫টি থেকে বাড়িয়ে ২৩৫টিতে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যস্ত সময়ে প্রায় ১৫ মিনিট পরপর ট্রেন চালানোর লক্ষ্যও রয়েছে। ফলে রাজধানীমুখী প্রতিদিনের যাত্রীদের জন্য সড়কপথের যানজটের বিকল্প হিসেবে রেল আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খরচ কমানো। বিদ্যুৎচালিত ট্রেন ব্যবহারে ট্রেন পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ কমতে পারে বলে প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি ব্যবহারের ধরন বদলের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমবে। প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৫ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হতে পারে।
প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা এবং এতে সরকারি অর্থের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থাকছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা ADB এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক বা EIB প্রকল্পটির অর্থায়নে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে এবং এর আনুমানিক ব্যয় ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল।
বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েক বছর ধরেই দেশের প্রধান রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ২০২৩ সালে তুরস্কের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশে বিদ্যুতায়নের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। মোট ৩৪৮ দশমিক ১৬ কিলোমিটার রেলপথ নিয়ে ওই সমীক্ষা করা হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর অংশকে প্রথম ধাপ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর অংশে বিদ্যুৎচালিত রেল চালুর প্রকল্পের DPP নিয়ে প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও অর্থায়নের প্রক্রিয়া শেষ করার পর বাস্তব কাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো করিডোরে প্রায় ১৮৬ ট্র্যাক-কিলোমিটার এলাকায় ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এর সঙ্গে থাকবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ধীরে ধীরে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতাও সম্প্রসারণ করা হবে। ফলে প্রকল্পটি শুধু নতুন ট্রেন কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ঢাকার আশপাশের কমিউটার রেলব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে।
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও জয়দেবপুর—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রুটের গুরুত্ব অনেক। তাই ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হলে শুধু রেলযাত্রী নয়, পুরো নগর পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের রেলব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মূলত ডিজেলচালিত ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সেই ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কম সময়ে বেশি যাত্রী পরিবহন, ঘন ঘন ট্রেন পরিচালনা এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুট দেশের আধুনিক কমিউটার রেলব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।


























